অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
চলতি অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি মেটানো ও সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে বাংলাদেশ সরকার এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি)-এর কাছে ১.৫ বিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তা চেয়েছে। ব্যাংকিং খাতের সংকটাপন্ন প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা সামনে আসায় এ সহায়তা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)-এর সূত্রে জানা গেছে, জলবায়ু নীতি-ভিত্তিক বাজেট সহায়তা কর্মসূচির আওতায় গত ১৩ আগস্ট এ প্রস্তাব পাঠানো হয় এবং এআইআইবি প্রাথমিকভাবে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে।
বেইজিংভিত্তিক এআইআইবি জানিয়েছে, তারা ইআরডি, অর্থ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাবে এবং প্রস্তাবিত কর্মসূচি পর্যালোচনা করবে। ইআরডি ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা আশা করছেন, এআইআইবি ছাড়াও বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে চলতি অর্থবছরে আরও ১.৮৫ বিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তা পাওয়া যাবে। বাজেট সহায়তা মূলত ঘাটতি মেটানো ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করার জন্য ব্যবহৃত হয়।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাজেট সহায়তার উদ্দেশ্য শুধু ঘাটতি পূরণ নয়, বরং প্রয়োজনীয় সংস্কারকে এগিয়ে নেওয়া। ঢাকায় বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের মতে, দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠন, কিছু প্রতিষ্ঠানের অবসায়ন এবং কিছু প্রতিষ্ঠানের পুনঃমূলধনীকরণের জন্য বড় তহবিল দরকার। তবে বাজেট সহায়তা কার্যকর হবে তখনই, যদি তা প্রবৃদ্ধি বাড়ায়, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা উন্নত করে এবং অর্থনীতির ঝুঁকি হ্রাসে সহায়তা করে।
ইআরডি তথ্য অনুযায়ী, সদ্য বিদায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৩.৪ বিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তা এসেছে। কোভিড-১৯ মহামারি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অভিঘাত এ প্রবণতা বাড়িয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাজেট সহায়তা ছিল ১ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২১-২২ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়ায় ২.৫৯ বিলিয়ন ডলারে। তবে চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে রাজস্ব আদায় ২১ শতাংশ বেড়েছে, কিন্তু লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৬,৫০০ কোটি টাকা।
সিপিডি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, সীমিত রাজস্ব আহরণের কারণে বাজেট বাস্তবায়নে চাপ বেড়েছে এবং বাজেট সহায়তার ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। আগে বাজেট সহায়তা মূলত আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, এডিবি বা জাপান থেকে আসত, এখন নতুন উৎস হিসেবে এআইআইবি যোগ হয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এ ধরনের সহায়তা ঋণ হিসেবেই আসে এবং সরকারের মোট ঋণ বাড়ায়, তাই এর দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
এআইআইবির ঋণকে হার্ড লোন ধরা হয়, কারণ এটি বাজারভিত্তিক সুদে দেওয়া হয়। ঋণের মেয়াদ ৩৫ বছর হলেও পাঁচ বছর গ্রেস পিরিয়ড রয়েছে এবং সুদের হার ৬ শতাংশ পর্যন্ত উঠতে পারে। গত জুনে এআইআইবি বাংলাদেশকে ৪০০ মিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছিল।
পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, বাজেট সাপোর্ট এখন সরকারের জন্য অপরিহার্য। বৈদেশিক খাতের চাপ, রিজার্ভ সংকট, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং রাজস্ব ঘাটতি এ প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়েছে। তিনি মনে করেন, বাজেট সহায়তা শুধু আর্থিক ঘাটতি মেটানোর জন্য নয়, বরং সংস্কার কার্যক্রমে বহিঃপ্রণোদক হিসেবেও কাজ করে। তবে বিদেশি ঋণ ইতিমধ্যে উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে বলে সতর্ক করে তিনি বলেন, নতুন হার্ড লোন অবশ্যই অগ্রাধিকারমূলক ও উচ্চ অর্থনৈতিক রিটার্নসম্পন্ন খাতে ব্যবহার করা উচিত।
বর্তমানে এডিবির সঙ্গে তিনটি বাজেট সহায়তা কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চলছে, যার আওতায় ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে ৮৫০ মিলিয়ন ডলার এবং ২০২৭ সালে আরও ৫০০ মিলিয়ন ডলার আসতে পারে। বিশ্বব্যাংকের প্রস্তাবিত পাইপলাইন তালিকা অনুযায়ী আগামী দুই অর্থবছরে ২.৭৭ বিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তা আসার সম্ভাবনা রয়েছে, যার মধ্যে চলতি অর্থবছরের মধ্যেই ৫০০ মিলিয়ন ডলার নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। আগের অর্থবছরে বিশ্বব্যাংক থেকে ১ বিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তা পাওয়া গিয়েছিল। ●
অকা/প্র/ই/সকাল/২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 9 months আগে

