অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
বাংলাদেশে টানা চার মাস ধরে মূল্যস্ফীতির গতি কমছে। সর্বশেষ জুন মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৪৮ শতাংশে, যা গত ৩৫ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর আগে ২০২২ সালের জুলাই মাসে দেশে সর্বশেষ এক অঙ্কের নিচে—৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ মূল্যস্ফীতি রেকর্ড হয়েছিল। এরপর থেকে মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কের কাছাকাছি ঘোরাফেরা করছিল।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) সোমবার (৭ জুলাই) বিকেলে জুন মাসের মূল্যস্ফীতির হালনাগাদ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে দেখা যায়, চলতি বছরের জুনে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৩৯ শতাংশে, যা গত দুই বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সময়ে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক ৩৭ শতাংশ।
বিবিএস-এর তথ্য অনুযায়ী, মার্চ ২০২৫-এ সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ, এপ্রিল মাসে তা কমে ৯ দশমিক ১৭ শতাংশ, মে মাসে আরও নেমে আসে ৯ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশে। আর সর্বশেষ জুন মাসে তা আরও কমে ৮ দশমিক ৪৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ফলে টানা চার মাস ধরে মূল্যস্ফীতি নিম্নমুখী ধারায় রয়েছে।
এ সম্পর্কে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রেস সচিব শফিকুল আলম গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সুচিন্তিত নীতিকৌশলের ফলে মূল্যস্ফীতি দ্রুত কমছে। জুন মাসে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৪৮ শতাংশে নেমেছে, যা ২০২৪ সালের আগস্ট মাসের তুলনায় প্রায় ২ শতাংশ কম।’
তিনি আরও লিখেন, ‘খাদ্য মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্য হারে কমে ৭ দশমিক ৩৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা গত দুই বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতিও কমার ধারায় রয়েছে এবং অচিরেই তা আরও কমবে বলে আমাদের প্রত্যাশা।’
বিবিএস-এর তথ্যে দেখা গেছে, খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতি শহর ও গ্রাম উভয় এলাকাতেই কমেছে। শহর এলাকায় জুন মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৯৯ শতাংশ, যা মে মাসে ছিল ৯ দশমিক ২৯ শতাংশ। অপরদিকে গ্রামীণ অঞ্চলে খাদ্য মূল্যস্ফীতি জুনে ছিল ৭ দশমিক ১৪ শতাংশ, যা মে মাসে ছিল ৮ দশমিক ৩০ শতাংশ।
খাদ্যবহির্ভূত খাতেও মূল্যস্ফীতির হ্রাস লক্ষ করা গেছে। শহরে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি জুনে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৫৩ শতাংশ, যা মে মাসে ছিল ৯ দশমিক ৬৩ শতাংশ। গ্রামে এই হার জুনে সামান্য কমে ৯ দশমিক ৭২ শতাংশ হয়েছে, মে মাসে ছিল ৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ।
দীর্ঘ সময় ধরে দেশের মূল্যস্ফীতি ছিল ঊর্ধ্বমুখী। ২০২৪ সালে দুই অঙ্কে থাকা মূল্যস্ফীতি নিয়ে অসন্তোষ বাড়তে থাকে সাধারণ মানুষের মধ্যে। উচ্চমূল্যস্ফীতির চাপ, চাকরির বাজারের অনিশ্চয়তা ও ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয় মিলিয়ে রাজনৈতিক অস্থিরতাও বাড়ে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব কারণেই ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। এরপর দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার, যার নেতৃত্বে রয়েছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ড. ইউনূস মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দেন। তার নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার মূল্যস্ফীতি কমাতে মুদ্রানীতির কড়াকড়ি, আমদানি খরচ নিয়ন্ত্রণ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ বাড়ানোর মতো উদ্যোগ নেয়।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে সরকার মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এ বিষয়ে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘বর্তমান সরকারের নীতিগত অবস্থান এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সমন্বিত উদ্যোগের কারণে সেপ্টেম্বরের মধ্যেই মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশে নেমে আসবে বলে আশা করা যায়।’
মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরতে সরকারের চলমান নীতিমালার ইতিবাচক প্রভাব ইতোমধ্যে দৃশ্যমান হয়েছে। চার মাস ধরে নিম্নমুখী প্রবণতা এবং খাদ্যপণ্যে ব্যয়ের হ্রাস অর্থনীতির জন্য স্বস্তির বার্তা বয়ে এনেছে। এখন দেখার বিষয়, সরকার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আগামী মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতি কতটা কমানো সম্ভব হয়। ●
অকা/প্র/ই/সকাল/৮ জুলাই, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 7 months আগে

