অর্থকাগজ ডেস্ক ●
ডাচ ডিজিজ কথাটি প্রথম ১৯৭৭ ব্যবহার করে দ্য ইকোনমিস্ট ম্যাগাজিন। ১৯৫৯ সালে নেদারল্যান্ডসে প্রাকৃতিক গ্যাসের বিশাল মজুদের সন্ধান পায় দেশটি।
বিপুল পরিমাণ গ্যাসের উত্তোলন ও রপ্তানির ফলে নেদারল্যান্ডসের অর্থনীতি প্রাথমিক দিকে সমৃদ্ধ হলেও পরবর্তী সময়ে এ গ্যাসেই তাদের বিপর্যয় ডেকে আনে অর্থনীতিতে। ফলে এক ধরনের অরাজকতার সৃষ্টি হয় তাদের জাতীয় জীবনে।
দ্য ইকোনমিস্ট ম্যাগাজিনটি নেদারল্যান্ডসের এ অর্থনৈতিক বিপর্যয়কে বুঝানোর জন্য ডাচ ডিজিজ কথাটির প্রয়োগ করেন। অর্থাৎ ডাচ ডিজিজ বলতে বোঝায় কোনো দেশ একটি মাত্র প্রাকৃতিক সম্পদ কিংবা একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর অতিনির্র্ভরতা (৮০ ভাগ বা বেশি) এবং ভবিষ্যতে এ সম্পদের কিংবা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ভঙ্গুর অবস্থা সৃষ্টি হলে যে আর্থিক মন্দার সৃষ্টি হয়, সেটাকে ডাচ ডিজিজ বলা হয়ে থাকে।
এখন বাংলাদেশের অর্থনীতি ডাচ ডিজিজে আক্রান্ত হতে পারে কি-না। কিংবা আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু-এ বিষয়ে আলোকপাত করব। আমরা যদি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর বর্ণনা করি, তাহলে দেখতে পাব স্বাধীনতাণ্ডউত্তর বাংলাদেশের অর্থনীতি গার্মেন্ট শিল্পের উত্তর নির্ভরশীল। কারণ আমাদের রপ্তানি কিংবা বৈদেশিক আয়ের সিংহভাগ আসে এ খাত থেকেই।
ফলে নেদারল্যান্ডস কিংবা ভেনিজুয়েলার মতো আমরাও একটি সম্পদ বা প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি, ফলে আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ডাচ ডিজিজে আক্রান্ত হওয়ার আশু সম্ভাবনা রয়েছে।
এখন একটি দেশ কীভাবে ডাচ ডিজিজে আক্রান্ত হয়, সেটি তুলে ধরা যাক। বর্তমান বিশ্বে ডাচ ডিজিজে আক্রান্ত হওয়ার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে ভেনিজুয়েলা। কারণ তারা বিশ্বে বৃহত্তম তেল রফতানি ও মজুদকারী দেশ হিসেবে পরিচিত ছিল।
দেশটিরও আর্থিক সমস্যার শুরু বিশ্ব বাজারে তেলের মূল্য হ্রাস দিয়েই। ২০১৪ সাল থেকে বিশ্ববাজারে তেলের দরপতন শুরু হয়।
অথচ ২০০৪ থেকে ২০১৩, এ সময়ের মধ্যে ভেনিজুয়েলা ছিল বিশ্বে সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আহরণ করা দেশগুলোর একটি, যখন তেলের মূল্য বিশ্ব বাজারে অনেক বেশি ছিল।
কিন্তু তেলের মূল্য কমতে শুরু করলে ভেনিজুয়েলা অর্থনীতি ধসে পড়ে। কারণ ক্রমহ্রাসমান অর্থনীতিকে সামাল দেওয়ার মতো অন্য কোনো রিসোর্স তাদের হাতে ছিল না। আর তেল রপ্তানি যখন তাদের জাতীয় আয়ের প্রধান উৎস, আর এটির যখন নাজুক অবস্থা তখন ভেনিজুয়েলায় দেখা দেয় মুদ্রাস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও বাজেট ঘাটতি সমস্যার শুরু হলে দেশটি অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়।
ভেনিজুয়েলা যেমন একটি সম্পদের ওপর নির্ভর করার ফলে মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে। আমাদেরও এমন সম্ভাবনা রয়েছে, কারণ আমাদের অর্থনীতিও তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। কারণ বাংলাদেশের দেশীয় কর্মসংস্থানের প্রায় ৬৫ শতাংশ ও বৈদেশিক আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ অর্জিত হয় এ শিল্পের মাধ্যমে। তৈরি পোশাক শিল্পের কারণে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ৫০ লাখ মানুষের, যার মাঝে ৮০ শতাংশ রয়েছেন নারী।
বাংলাদেশের অর্থনীতির পরিসংখ্যান বলে দেয়, আমাদের দেশও ডাচ ডিজিজে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, কারণ ২০২৬ সালে বাংলাদেশ LDC (Least developed country) থেকে পুরোপুরি বের হয়ে যাবে এবং মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত হবে। এখন এলডিসি থেকে বের হলে বাংলাদেশের কিছু বাণিজ্য ও অন্যান্য সুবিধা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। যেমন GSP, TRIPS, ODA, DFQF মতো সুবিধা। আর GSP সুবিধা হচ্ছে (Generalised System of Preference) বা অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা, যা স্বল্পোন্নত দেশের পণ্য ধনী দেশে আমদানির ক্ষেত্রে তাদের শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়, যা রপ্তানি আয়ের দিক থেকে অনেক সুবিধাজনক।
কিন্তু ২০২৬ সালে আমাদের এ সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে, ফলে অন্য পোশাক রপ্তানিকারী দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকা দুষ্কর হয়ে পড়বে। ২০২৬ সালে যখন বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে, তখন শ্রমিকদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করতে হবে এবং উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে।
অপরদিকে GSP সুবিধা না থাকার কারণে পণ্যের মূল্য বেড়ে যাবে, ফলে অন্যদেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে আমরা মার্কেটে টিকতে পারব না। আবার চীনের মতো দেশ আফ্রিকা মহাদেশের দরিদ্র দেশগুলোতে পোশাক কারখানা তৈরি করার মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে। সেসব দেশের কারখানায় পোশাক উৎপাদন শুরু হলে তারা কম শ্রমমজুরিতে পোশাক উৎপাদন করবে এবং উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে LDC সুবিধা পাবে, ফলে আমাদের চেয়ে অনেক কম মূল্যে পোশাক রপ্তানি করবে আবার ইউরোপ এর দেশগুলো তাদের নিকটবর্তী হওয়ায় পরিবহন খরচ কমবে ও দ্রুত সময়ে মার্কেট পৌঁছাবে।
অর্থাৎ সামনের সময়গুলোতে আমাদের অর্থনীতি ও পোশাক শিল্প একটা বিপর্যয়ের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে কারণ GSP সুবিধার বাইরে চলে যাওয়ার পর এবং আফ্রিকার দরিদ্র দেশগুলোর পোশাক শিল্পের প্রসার ঘটলে আমাদের পোশাকশিল্প বৈশ্বিক বাজারে আধিপত্য ধরে রাখতে পারবে না। ফলে আমাদের তৈরি পোশাক শিল্পে মন্দাভাব শুরু হবে। আর বৈশ্বিক বাজারে ধস নামলে আমাদের গার্মেন্ট থেকে যে বৈদেশিক আয়, তা বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে লাখ লাখ শ্রমিকের ভবিষ্যৎ শঙ্কার দারপ্রান্তে।
আর ডাচ ডিজিজে আক্রান্ত হলে আমাদের দেশে বেকার সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করবে এবং মুদ্রাস্ফীতির ফলে দেশের অর্থনীতি ধসে পড়বে।
ভবিষ্যতে ডাচ ডিজিজ মোকাবিলার জন্য আমাদের করণীয় হচ্ছে FTA (Free trade agreement) চুক্তি করা, যার ফলে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য কূটনীতির মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক, আঞ্চলিক ও বহুপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনসহ মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল গঠন, শুল্ক সুবিধা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে বাংলাদেশের পণ্য ও সেবার জন্য আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণ, অশুল্ক বাধা দূরীকরণ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ট্রেড ফোরামের নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষা করা যাবে।
পাশাপাশি কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে PTA (Preferential Trade Agreement) চুক্তি করা ফলে দুটি দেশের মধ্যে কোনো পণ্য আমদানি প্রয়োজন হলে চুক্তিবদ্ধ দেশের মধ্যে সেটি উৎপাদন হলে সেখান থেকে ক্রয় করা।
আমাদের দেশের নীতিনির্ধারকরা যদি আন্তরিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে এসবের বাস্তবায়ন করতে পারে, তবে ডাচ ডিজিজকে আমরা মোকাবিলা করতে সক্ষম হবো। পাশাপাশি আমাদের কর্মক্ষম জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তর করে রেমিট্যান্স যোদ্ধা হিসেবে তৈরি করা এবং যুবকদের প্রযুক্তিগত জ্ঞান বৃদ্ধি করতে সরকারিভাবে সহযোগিতার হাত প্রসার করা, তবেই আমরা আশু বিপর্যয় মোকাবিলা করতে সক্ষম হবো।
#
অকা/প্র/সন্ধ্যা, ৬ এপ্রিল, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 4 years আগে

