অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
বিশ্বব্যাংক ২০২৫ সালের জুন মাসে আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমার হালনাগাদ সংজ্ঞা প্রকাশ করেছে, যা বৈশ্বিকভাবে দারিদ্র্য পরিমাপের পদ্ধতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই হালনাগাদ অনুযায়ী, এখন থেকে যদি কোনো ব্যক্তি দৈনিক ৩ ডলারের কম মূল্যের পণ্য ও সেবা (PPP বা ক্রয়ক্ষমতা সমতা ভিত্তিতে) ব্যবহার করতে সক্ষম না হন, তবে তাকে অতিদারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী হিসেবে গণ্য করা হবে। ২০১৭ সাল থেকে প্রচলিত পূর্ববর্তী সংজ্ঞা অনুযায়ী এই সীমা ছিল ২.১৫ ডলার, ফলে নতুন সীমা প্রবর্তনে আরও বেশি মানুষের দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকার বাস্তবতা প্রতিফলিত হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের এই নতুন দারিদ্র্যসীমা শুধু সাধারণ পরিমাপ নয়, বরং এটি বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার একটি স্বীকৃতি। কোভিড-১৯ পরবর্তী মূল্যস্ফীতি, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট, বৈশ্বিক মন্দার অভিঘাত এবং বিভিন্ন অঞ্চলে রাজনৈতিক অস্থিরতার ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। পাশাপাশি, ক্রয়ক্ষমতার ভিন্নতা বিবেচনায় দারিদ্র্য নির্ধারণে সমতা রক্ষা করা জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বিশ্বব্যাংক নিম্ন ও উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশগুলোর জন্যও পৃথক দারিদ্র্যসীমা হালনাগাদ করেছে। নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশগুলোর ক্ষেত্রে পূর্বে ৩.৬৫ ডলার/দিন সীমা ছিল, যা এখন ৪.২০ ডলারে উন্নীত হয়েছে। উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশগুলোর জন্য এই সীমা ৬.৮৫ ডলার থেকে ৮.৩০ ডলারে উন্নীত হয়েছে।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই পরিবর্তনের তাৎপর্য বিশাল। বাংলাদেশ বর্তমানে একটি নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ, যার কারণে ৪.২০ ডলার/দিন সীমা এখন প্রযোজ্য। ২০২২ সালের বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) উপাত্ত অনুযায়ী, যদি আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমা অর্থাৎ ৩ ডলার/দিন ভিত্তি ধরা হয়, তবে দেশের ৮.০১ শতাংশ মানুষ এই সীমার নিচে অবস্থান করছে। অথচ, আগের ২.১৫ ডলার/দিন সীমা অনুযায়ী এই হার ছিল ৫ শতাংশ। অর্থাৎ নতুন সীমা অনুসরণ করলে অতিদারিদ্র্য জনগোষ্ঠীর পরিধি বেড়েছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের মতো নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে ৪.২০ ডলার/দিন সীমা অনুযায়ী অতিদারিদ্র্যের হার দাঁড়ায় ২৪.৪৩ শতাংশ, যেখানে আগের ৩.৬৫ ডলারের সীমা অনুযায়ী এই হার ছিল ৩০ শতাংশ। এটি সামান্য হ্রাস দেখালেও বাস্তবতা হলো, দেশের প্রায় এক-চতুর্থাংশ জনগোষ্ঠী এখনো এমন পরিস্থিতিতে রয়েছে যেখানে তারা দৈনিক ৪.২০ ডলারেরও কম ক্রয়ক্ষমতা রাখে। এর মধ্যে বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদ, পাহাড়ি ও চরাঞ্চলের মানুষ, এবং শহরের অনানুষ্ঠানিক শ্রমজীবী জনগোষ্ঠী সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ।
বিশ্বব্যাপী পরিসরে, বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে বর্তমানে প্রায় ৮১ কোটি মানুষ নতুন আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে, অর্থাৎ বিশ্বের প্রতি ১০ জনে একজন অতিদারিদ্র। আফ্রিকার সাহেল অঞ্চল, দক্ষিণ এশিয়ার গ্রামীণ এলাকা, এবং লাতিন আমেরিকার কিছু অংশে এই চিত্র আরও প্রকট। তবে শুধু উন্নয়নশীল দেশই নয়, মধ্যম আয়ের অনেক দেশেও আঞ্চলিক বৈষম্য ও অভ্যন্তরীণ আয়বৈষম্যের কারণে দারিদ্র্যের চাপ বাড়ছে।
বিশ্বব্যাংকের দারিদ্র্য পরিমাপের ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, সংস্থাটি ২০০১ সাল থেকে এই সূচক হালনাগাদ করে আসছে। ২০০৮, ২০১৫, এবং সর্বশেষ ২০২২ সালে এই সূচকে পরিবর্তন আনা হয়। তবে ২০১৭ সালে এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে মধ্যম আয়ের দেশগুলোর জন্য আলাদা দারিদ্র্যসীমা নির্ধারণ করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল জাতীয় স্তরের নীতিনির্ধারণে আরও প্রাসঙ্গিক ও দেশ-ভিত্তিক বৈচিত্র্যকে প্রতিফলিত করা।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই হালনাগাদ সংজ্ঞা সরকার ও নীতিনির্ধারকদের জন্য স্পষ্ট বার্তা বহন করে। প্রথমত, দেশের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো পুনর্বিবেচনা করা জরুরি হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে বয়স্ক ভাতা, কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা কর্মসূচি (Employment Generation Program), ক্ষুদ্রঋণ, এবং নগদ সহায়তা কার্যক্রমকে আরও টার্গেটেড ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, খাদ্য নিরাপত্তা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে দারিদ্র্য-দূরীকরণে দীর্ঘমেয়াদী ফল পাওয়া সম্ভব।
আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর জন্যও এই নতুন দারিদ্র্যসীমা গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত দিকনির্দেশনা প্রদান করে। তারা যাতে প্রকৃত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা দিতে পারে, তার জন্য এই নতুন সীমা ও পরিসংখ্যান ব্যবহার করা অপরিহার্য। তাছাড়া, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs) অর্জনের পথে এটি একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরে, যেখানে দারিদ্র্য হ্রাসের অগ্রগতি কতটা দৃশ্যমান তা নিরূপণ করা যায়।
বিশ্বব্যাংকের এই হালনাগাদ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, দারিদ্র্য এখন কেবল আয় দিয়ে পরিমাপযোগ্য নয়, বরং এটি একটি বহুমাত্রিক বাস্তবতা—যেখানে খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রতিটি দেশের জন্য এটি আত্মসমালোচনার এক সুযোগ, যেখানে উন্নয়নের বর্ণাঢ্য পরিসংখ্যানের পাশাপাশি প্রান্তিক মানুষের জীবনের মান, নিরাপত্তা এবং সম্ভাবনার কথাও সমান গুরুত্ব পায়। ●
অকা/প্র/ই/সকাল/১৪ জুন, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 12 months আগে

