অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
একসময় সাধারণ মানুষের নিরাপদ ও লাভজনক বিনিয়োগের ক্ষেত্র বলা হতো সঞ্চয়পত্রকে। ব্যাংকে আমানত রাখলে ৫ শতাংশের নিচে মুনাফা। ফলে এত কম লাভে ব্যাংকে টাকা রাখায় আগ্রহী নয় সাধারণ মানুষ। আবার পুঁজিবাজারেও কোনো স্থিতিশীলতা নেই। পুঁজির নিরাপত্তা নিয়ে চরম ঝুঁকি। এসব কারণে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে মধ্যবিত্তের বিনিয়োগের পছন্দের জায়গা ছিল সঞ্চয়পত্র।
অবসরপ্রাপ্ত সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী, প্রবাসী বা সাধারণ মানুষ, এমনকি অনেক নারীরাও তাদের শেষ সম্বল এই সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করে ওই মুনাফা দিয়ে সংসার চালাতেন। তবে সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমানো ও নানা কড়াকড়ির ফলে এখান থেকে ক্রমেই মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন মধ্যবিত্তরা। টানা দুই অর্থবছরই এ খাতে সাধারণ মানুষের বিনিয়োগ কমেছে। এর মধ্যে বিদায়ী অর্থবছর সঞ্চয়পত্রে যা বিনিয়োগ হয়েছে, তার চেয়ে বেশি ভাঙানো হয়েছে। ফলে নিট বিক্রি ঋণাত্মক হয়ে গেছে।
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছর সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয় ১ লাখ ১২ হাজার ১৮৮ কোটি টাকার। এ সময়ে মূল পরিশোধ বা সঞ্চয়পত্র ভাঙানো হয় ৭০ হাজার ২২৯ কোটি টাকা। ফলে ওই অর্থবছর সঞ্চয়পত্র নিট বিক্রি দাঁড়ায় ৪১ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা।
২০২১-২২ অর্থবছরে তার আগের অর্থবছরের চেয়ে সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমে। ওই বছর ১ লাখ ৮ হাজার ৭১ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়। তবে এ সময় মূল্য পরিশোধ আগের অর্থবছরের চেয়ে বেড়ে যায়। ওই অর্থবছর সঞ্চয়পত্র ভাঙানো হয় ৮৮ হাজার ১৫৫ কোটি টাকায়। ফলে নিট বিক্রিতে ধস নামে। অর্ধেকের চেয়েও বেশি কমে সে বছর নিট বিক্রি দাঁড়ায় ১৯ হাজার ৯১৬ কোটি টাকা।
অপরদিকে বিদায়ী অর্থবছর সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে সবচেয়ে বেশি ধস নামে। এজন্য আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের শর্তকে দায়ী মনে করা হচ্ছে। কারণ আইএমএফ থেকে ৪৫০ কোটি ডলার ঋণের শর্ত ছিল সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের ঋণ এখন যা আছে, তা ২০২৬ সালের মধ্যে এক-চতুর্থাংশ কমাতে হবে। এজন্য সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে শর্ত আরও কঠিন করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৮০ হাজার ৮৫৯ কোটি টাকা সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে, যা তার আগের অর্থবছরের চেয়ে ২৫ দশমিক ১৮ শতাংশ কম। আর মানুষ গত অর্থবছর সঞ্চয়পত্র ভাঙিয়েছে ৮৪ হাজার ১৫৫ কোটি টাকার। ফলে নিট বিক্রি ছিল ৩ হাজার ২৯৬ কোটি টাকা ঋণাত্মক, যা তার আগের অর্থবছরের চেয়ে ১১৬ দশমিক ৫৫ শতাংশ নেগেটিভ। যেখানে ওই অর্থবছর নেগেটিভ ছিল ৫২ দশমিক ৫৪ শতাংশ।
বাজেটের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা পরিশোধ বাবদ সরকারের ব্যয়ের পরিমাণ ১ লাখ ৭৩ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা। এছাড়া উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে অনেকেই জমানো সঞ্চয় ভেঙে ফেলছেন। অন্যদিকে তাদের পক্ষে নতুন করে সঞ্চয় করার প্রবণতাও কমে গেছে। ফলে তাদের মধ্যে নতুন সঞ্চয়পত্র কেনার চেয়ে ভাঙানোর প্রবণতা বেশি। যার ফলে বিদায়ী অর্থবছর এ খাতে নিট বিক্রি নেগেটিভ ছিল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
জানা গেছে, ব্যাংকগুলোর আমানতের সুদের হার কম এবং পুঁজিবাজারে দীর্ঘ মন্দার কারণে বেশ কয়েক বছর ধরে সঞ্চয়পত্র বিক্রি অনেক বেশি পরিমাণে বাড়ছিল। এতে সরকারের সুদ পরিশোধের ব্যয়ও অনেক বেশি বেড়ে যায়। সঞ্চয়পত্রের উচ্চ মুনাফা বা সুদ পরিশোধ করতে গিয়ে সরকারের নগদ ও ঋণ ব্যবস্থাপনার ওপর অনেক বেশি চাপ পড়ছে। ফলে সঞ্চয়পত্র বিক্রির চাপ কমাতে ২০১৯ সালের জুলাই থেকে বিভিন্ন কড়াকড়ি আরোপ করে আসছে সরকার।
এ খাতে আরোপ করা বিভিন্ন শর্তের মধ্যে রয়েছে-সঞ্চয়পত্রে পাঁচ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে আয়কর রিটার্ন সনদ বাধ্যতামূলক করা, ১৫ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের সুদহার ২ শতাংশ কমানো, সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগ সীমা কমিয়ে আনা, মুনাফার ওপর উৎসে আয়করের হার ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা। এছাড়া দুর্নীতি কিংবা কালো টাকায় সঞ্চয়পত্র কেনা বন্ধে ক্রেতার তথ্যের একটি ডাটাবেজ তৈরি করা হয়েছে। এসব কড়াকড়ির প্রভাবে বর্তমানে সঞ্চয়পত্র বিক্রি তলানিতে নেমে গেছে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, এখন মানুষ আর সঞ্চয়পত্র কিনছে না। এর পেছনে তিনটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, ৫ লাখ টাকার ওপরে সঞ্চয়পত্র কিনতে গেলে আয়কর রিটার্ন দিতে হচ্ছে। কিন্তু নানারকম ঝামেলার কারণে অনেকেই আয়কর রিটার্ন দিতে চান না। ফলে তারা এখান থেকে ধীরে ধীরে সরে আসছে। দ্বিতীয়ত, যাদের সঞ্চয়পত্র এক কোটি টাকার বেশি ছিল, সীমা নির্ধারণের কারণে এসব সঞ্চয়পত্রে মেয়াদ শেষে তারা আর নতুন করে কিনতে পারছেন না। তৃতীয়ত, মানুষের হাতে এখন টাকা কম আছে। বর্তমান মূল্যস্ফীতির চাপে মানুষ আর আগের মতো সঞ্চয় করতে পারছেন না। এসব কারণে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকার কম ঋণ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অনেক বেশি ঋণ নিচ্ছে। তবে এটি আরও বেশি ক্ষতিকর। কেননা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে তা সরাসরি মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব ফেলে।
তিনি আরও বলেন, সঞ্চয়পত্র সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ভূমিকা রাখার কথা না। কারণ এটি একটি আর্থিক উপকরণ, যার মাধ্যমে গ্রাহক মুনাফা লাভ করে। তাই সঞ্চয়পত্রকে আর্থিক উপকরণ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে। তবে সরকার এক্ষেত্রে ভুল নীতি গ্রহণ করেছে।
প্রসঙ্গত, বর্তমানে চার ধরনের সঞ্চয়পত্র প্রচলিত রয়েছে। এর মধ্যে ৫ বছর মেয়াদি পরিবার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১১ দশমিক ৫২, ৫ বছর মেয়াদি পেনশনার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১১ দশমিক ৭৬, ৫ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১১ দশমিক ২৮ এবং ৩ বছর মেয়াদি ও ৩ মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১১ দশমিক ০৪ শতাংশ।
অকা/প্র/ সকাল, ২৪ আগস্ট, ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 3 years আগে

