অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
বাংলাদেশের রফতানি আয়ের সবচেয়ে বড় একক গন্তব্য হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। তাই দেশটির পক্ষ থেকে নতুন করে আরোপিত অতিরিক্ত শুল্ক শুধু তৈরি পোশাক খাত নয়, বরং পুরো রফতানি খাতকে অস্থির করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষক ও শিল্প উদ্যোক্তারা। তাদের মতে, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেবল বিকল্প বাজার খুঁজে সমাধান সম্ভব নয়, বরং প্রয়োজন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনায় অগ্রাধিকার দেওয়া এবং প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধির বাস্তব পরিকল্পনা।
বাংলাদেশ রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যমতে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে মোট ৯৮ ধরনের পণ্য রফতানি হয়েছে। এর মধ্যে প্রচলিত পণ্যের পাশাপাশি রয়েছে অপ্রচলিত বহু পণ্যও। তবে দেশের মোট রফতানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে, আর একক দেশ হিসেবে সবচেয়ে বড় বাজার হলো যুক্তরাষ্ট্র। অনেক পোশাক কারখানা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের জন্যই তৈরি, যেগুলো গড়ে তোলা হয়েছে মার্কিন ক্রেতাদের কমপ্লায়েন্স অনুসরণ করে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিশ্লেষণ বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২,৩৭৭টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রফতানি করেছে। এর মধ্যে ৮০১টি প্রতিষ্ঠান তাদের মোট রফতানির ৫০ শতাংশের বেশি যুক্তরাষ্ট্রে করেছে। এই ৮০১টি প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত রফতানি ৬৬২ কোটি ডলার, যার মধ্যে ৫০৫ কোটি ডলারই গেছে যুক্তরাষ্ট্রে। এককভাবে এটাই যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের মোট রফতানির ৫৮ শতাংশ। সব মিলিয়ে গত অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে ৮৭৬ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি করেছে বাংলাদেশ, যার মধ্যে ৭৫৯ কোটি ডলার এসেছে তৈরি পোশাক খাত থেকে।
রফতানিকারকদের একাংশ এরইমধ্যে অর্ডার হারানোর শঙ্কায় পড়েছে। ফরচুন অ্যাপারেলস নামের একটি তৈরি পোশাক প্রতিষ্ঠান গত অর্থবছরে তিন কোটি ৩৭ লাখ ডলারের পণ্য রফতানি করেছে যুক্তরাষ্ট্রে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুস সালাম জানান, ভারতের মতো প্রতিযোগী দেশগুলোর ট্যারিফ কম হওয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ছে। তাদের শুল্ক কম, আর বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি পড়ছে। এর ফলে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না। তিনি বলেন, ফরচুন অ্যাপারেলসের মতো প্রায় ১৬৮টি কারখানা রয়েছে যারা শুধু মার্কিন বাজারের জন্যই পোশাক উৎপাদন করে, এবং এরা এখন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে।
আরেক রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান ইনডিপেনডেন্ট অ্যাপারেলস গত অর্থবছরে তাদের মোট রফতানির ৮৯ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রে করেছে। তিন দশক ধরে প্রতিষ্ঠানটি মার্কিন বাজারে পোশাক রফতানি করছে। তাদের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম আবু তৈয়ব বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্ডার সাধারণত বৃহৎ পরিসরের হয়, একেকটি অর্ডার মিলিয়ন পিসেরও বেশি। এজন্য প্রায় হাজারখানেক কারখানা যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রফতানি করে থাকে। বছরে ৯ বিলিয়ন ডলারের রফতানি হচ্ছিল, এবং তা ক্রমেই বাড়ছিল। কিন্তু এখন পরিস্থিতির উন্নতি না হলে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে, এবং হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়বে।
এই অবস্থায় বাস্তব ক্ষতির উদাহরণও সামনে আসছে। ১১ জুলাই মার্কিন খুচরা জায়ান্ট ওয়ালমার্টের জন্য বরাদ্দকৃত ১০ লাখ পিস সাঁতারের প্যান্টের অর্ডার স্থগিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্যাট্রিয়ট ইকো অ্যাপারেল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইকবাল হোসেন। শুধু ওয়ালমার্ট নয়, আরও বেশ কয়েকটি মার্কিন ক্রেতাও অর্ডার স্থগিত করেছে বলে জানান বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক এবং ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল। তিনি বলেন, যেসব অর্ডার ১ আগস্টের আগেই সরবরাহ করা যাবে, সেগুলোর ক্ষেত্রে ঝুঁকি কম। কিন্তু যেগুলো আগস্টের পর ডেলিভারি দেওয়ার কথা, সেগুলোর ক্ষেত্রে ক্রেতারা অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। ফলে একটি ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।
শুধু তৈরি পোশাক নয়, জুতা, টুপি, তাঁবু, ব্যাগ, আসবাব, হিমায়িত খাদ্য, মাছ ও শাকসবজিসহ নানা পণ্য রফতানির ক্ষেত্রেও একই ধরনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ১৭৬টি প্রতিষ্ঠান এককভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর নির্ভর করে। ৭০৩টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৩১৯টি প্রতিষ্ঠান তাদের মোট রফতানির ৫০ শতাংশের বেশি যুক্তরাষ্ট্রে করে থাকে। তাদের অনেকেই ইতোমধ্যে অর্ডার স্থগিত হওয়ার তথ্য দিয়েছেন।
মাসুদ অ্যাগ্রো প্রসেসিং ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেড ২০১২ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রে হিমায়িত খাদ্য রফতানি করছে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশরাফ হোসেন বলেন, আমাদের যেসব পণ্য প্যাকিং পর্যায়ে ছিল, সেগুলো প্যাক না করতে বলেছে বায়াররা। তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। অনেক প্রতিষ্ঠানই এই বাজারের ওপর নির্ভর করে ব্যবসা গড়ে তুলেছে, তাই অনিশ্চয়তা তাদের সবাইকে নাড়া দিচ্ছে।
এদিকে চামড়াজাত পণ্যের ক্ষেত্রেও মার্কিন বাজার বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড়। ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ২৮৯ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলারের চামড়াজাত পণ্য রফতানি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নসিম মঞ্জুর বলেন, যুক্তরাষ্ট্র শুধু সবচেয়ে বড় রফতানি গন্তব্যই নয়, সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল বাজারও। এখন যদি ক্রেতাদের খরচ বেড়ে যায়, তারা হয়তো অর্ডার কমিয়ে দেবে বা দাম কমাতে বলবে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়বে রফতানিকারকদের ওপর। তিনি বলেন, চীন থেকে অনেক বায়ার তাদের গন্তব্য বদলাচ্ছিল, এ অবস্থায় ভারত বা কম্বোডিয়ার চেয়ে আমাদের শুল্ক বেশি হলে সুযোগ হারাব আমরা। শুধু পোশাক নয়, সব ধরনের পণ্যের ব্যাপারেই সরকারকে এখন ভাবতে হবে।
দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতির প্রসঙ্গও উঠে এসেছে শুল্ক বৃদ্ধির পেছনে যুক্তি হিসেবে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে ৯০৪ মিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করলেও বাংলাদেশ সেই সময়ে দেশটি থেকে আমদানি করেছে মাত্র ২০৩ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। ফলে ওই মাসেই ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭০১ মিলিয়ন ডলার। পুরো ২০২৪ সাল জুড়ে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে ৮৩৬ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি করে, আর আমদানি করে মাত্র ২২১ কোটি ডলারের পণ্য। সেই হিসেবে বার্ষিক বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়ায় ৬১৫ কোটি ডলার।
এই ঘাটতির কারণ দেখিয়ে ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশের রফতানি পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ৩৭ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপ করেন। আগেই ছিল ১৫ শতাংশ শুল্ক, পরে তা কমিয়ে ১৩ শতাংশ করা হলেও এখন ১ আগস্ট থেকে কার্যকর হচ্ছে মোট ৫০ শতাংশ শুল্ক। হোয়াইট হাউস বলছে, বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাস করতে এবং আমদানি নির্ভরতা কমাতেই এই শুল্ক আরোপ করা হচ্ছে।
এই অবস্থায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সময় থাকতে কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে। পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মাশরুর রিয়াজ বলেন, নতুন শুল্ক কার্যকর হলে প্রাথমিকভাবে রফতানি কমে যাবে। কারণ বায়াররা বুঝতে চাইবে, অতিরিক্ত ৩৫ শতাংশ শুল্কের বোঝা কে বহন করবে—ক্রেতা, বিক্রেতা না উভয়ে ভাগ করে? এ বিষয়ে অনিশ্চয়তার কারণে অর্ডার হোল্ড করবে তারা। তবে শেষ পর্যন্ত বাজারের বাস্তবতায় এর একটা সমাধান আসবে।
তিনি বলেন, আমাদের প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় শুল্ক যেন বেশি না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বিকল্প বাজারও খুঁজতে হবে, উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়াতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজার আমাদের জন্য বড়, সম্ভাবনাময় এবং আমরা এটা হারাতে পারি না।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, যুক্তরাষ্ট্র চাইছে, তাদের দেশ থেকে কে কত বেশি আমদানি করে। সেই অনুযায়ী শুল্ক ছাড় দেওয়ার চিন্তা করছে। এখন আমরা চাইলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সয়াবিন, তুলা, গম ও মেশিনারিজের মতো দরকারি পণ্যের আমদানি বাড়াতে পারি। তবে বোয়িংয়ের মতো অপ্রয়োজনীয় ব্যয়বহুল পণ্য আমদানি না করাই ভালো। এতে চাপ বাড়বে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা যেতে পারে।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক ব্যবস্থায় বাংলাদেশের রফতানি খাত বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এখনই সময় কৌশল নির্ধারণের—কীভাবে বাজার ধরে রাখা যায়, নতুন বাজার তৈরি করা যায় এবং আলোচনা ও কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে এই সঙ্কট থেকে উত্তরণ সম্ভব হয়। ●
অকা/প্র/ই/সকাল/১৪ জুলাই, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 11 months আগে

