অর্থকাগজ প্রতিবেদন
দেশের সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকার প্রতি বছর বিভিন্ন খাতে হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, সেবার মানোন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। তবে বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ প্রকল্পই নির্ধারিত সময়ে শেষ করা যাচ্ছে না। প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রিতা এখন একটি স্বাভাবিক চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত বাজেটের অতিরিক্ত ব্যয়, কার্যক্রমের ধীরগতি এবং দায়মুক্তির সংস্কৃতি। এর ফলে অপচয় হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা, যা শেষ পর্যন্ত জনগণের করের বোঝা হিসেবে ফিরে আসছে।
প্রায় প্রতিটি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি)-তেই দেখা যায়, বহু প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়ায় মেয়াদ বাড়াতে হচ্ছে, বাড়ছে বরাদ্দকৃত অর্থের পরিমাণও। অথচ এসব প্রকল্পের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ বছরের শুরুতে ছাড় করা যাচ্ছে না, কারণ মেয়াদ বা সংশোধনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়নি। এর ফলে অর্থবছরের প্রথম কয়েক মাস ওইসব প্রকল্পে অর্থব্যয় বন্ধ থাকে, যার প্রভাব পড়ে সামগ্রিক এডিপি বাস্তবায়নের ওপর।
সরকারি প্রকল্পগুলোর এই দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে। পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে ঘাটতি, সময়মতো অর্থছাড় না হওয়া, দক্ষ প্রকল্প পরিচালকের অভাব, ঠিকাদারদের দায়িত্বহীনতা ও পালিয়ে যাওয়ার প্রবণতা, এবং জলবায়ু বা মৌসুমি বাধার মতো বহুমাত্রিক কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকল্প গ্রহণের আগে উপযুক্ত পরিকল্পনা, সময়ানুগ তদারকি এবং দায়িত্বশীলতা না থাকায় প্রকল্পগুলো কার্যকর ফল দিচ্ছে না। প্রকল্প পরিচালকদের অদক্ষতা ও গাফিলতির পাশাপাশি অর্থছাড়ের প্রক্রিয়াগত জটিলতাও প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সাবেক সচিব আবুল কাশেম মো. মহিউদ্দিন বলেন, দেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে এখন একটি স্বচ্ছ ও কঠোর নির্দেশনার প্রয়োজন। বছরের পর বছর ধরে একই ধরনের বিলম্ব ও ব্যয়বৃদ্ধি চললেও প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না, যা জবাবদিহির ঘাটতির স্পষ্ট প্রতিফলন। প্রকল্প পরিচালকেরা এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করলেও, দোষ শুধু তাদের উপর বর্তায় না। প্রকল্পের সময়মতো অর্থছাড় না হওয়া, দরপত্র প্রক্রিয়ার বিলম্ব, ঠিকাদারদের দায়িত্বহীনতা, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে জলবায়ুজনিত সমস্যাও প্রকল্প বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
এই দীর্ঘসূত্রিতা ও ব্যয়বৃদ্ধির সর্বশেষ প্রমাণ মিলেছে চলমান ৪০৪টি উন্নয়ন প্রকল্পে, যেগুলোর কাজ এখনও অসমাপ্ত হলেও আগামী জুনে নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে। পরিকল্পনা কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (এনইসি) এসব প্রকল্পে নতুন অর্থছাড় এবং ব্যয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। পরবর্তী অর্থবছরের এডিপিতে এই প্রকল্পগুলোকে ‘তারকা চিহ্ন’ দিয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও মেয়াদ না বাড়ানো পর্যন্ত কোনো অর্থ ছাড় বা ব্যয় করা যাবে না।
বিগত বছরগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, এমন পরিস্থিতি প্রায় প্রতি অর্থবছরেই ঘটে চলেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের মূল এডিপিতে ৩৯৫টি মেয়াদোত্তীর্ণ প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত ছিল, যেগুলোর বেশিরভাগই ছিল আগের অর্থবছর বা তারও আগের। এমনকি ২০২২-২৩ অর্থবছরের মেয়াদোত্তীর্ণ প্রায় ৩০০টি প্রকল্পকেও ‘তারকা চিহ্ন’ দিয়ে পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এসব প্রকল্পের অনেকগুলোর কার্যক্রম ১০ থেকে ১৫ বছর ধরে চলমান, কিন্তু এখনো সম্পন্ন হয়নি। বারবার একই ভুলের পুনরাবৃত্তি হলেও সংশ্লিষ্টদের কোনো জবাবদিহির আওতায় আনা হয়নি।
ঘোড়াশাল-৩ রিপাওয়ারিং প্রজেক্ট, ধনুয়া থেকে ময়মনসিংহ পর্যন্ত গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণ এবং বিআরটি প্রকল্পে এসি বাস সংগ্রহের মতো প্রকল্পগুলো এর স্পষ্ট উদাহরণ। ঘোড়াশাল প্রকল্পটি ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে শুরু হলেও আজও শেষ হয়নি। গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৫ সালের জুনে, কিন্তু বাস্তবায়নে অগ্রগতি প্রায় নেই। বিআরটি প্রকল্পে অবকাঠামো নির্মাণ প্রায় শেষ হলেও সিএনজিচালিত এসি বাস সংগ্রহে কার্যক্রমই শুরু হয়নি। দক্ষিণ কোরিয়া থেকে আনা বাসগুলোর দরজার কাঠামো বাংলাদেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, ফলে সেগুলোর জন্য বিশেষ অর্ডার প্রয়োজন। কিন্তু সেখানেও চলছে দীর্ঘসূত্রিতা।
এ অবস্থায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের আগে যথাযথ যাচাই, সময়োপযোগী পরিকল্পনা, এবং বাস্তবায়নের প্রতিটি স্তরে কার্যকর তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে এই অব্যবস্থাপনা চলতেই থাকবে। এর ফলে অপচয় হবে রাষ্ট্রের সম্পদ, জনগণের প্রত্যাশা অপূর্ণ থাকবে এবং উন্নয়নের যে কাঠামো গড়ে তোলার কথা ছিল তা বাস্তবে অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
তারা আরও বলেন, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির মধ্যে যেসব প্রকল্প বছরের পর বছর চলতে থাকে, তাদের জন্য পৃথক মূল্যায়ন কাঠামো থাকা উচিত, যাতে প্রকৃত অগ্রগতি ও কার্যকারিতা বিশ্লেষণ করা যায়। নয়তো প্রকল্প নীতির শিথিলতা ও প্রশাসনিক উদাসীনতায় দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছাতে পারবে না। প্রকল্প বাস্তবায়নে শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা আনতে হলে পরিকল্পনার প্রতিটি স্তরে জবাবদিহির কঠোর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে—এখনই।
অকা/প্র/ই/সকাল/২১ মে,২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 1 year আগে

Leave A Reply

Exit mobile version