অর্থকাগজ প্রতিবেদন

বাংলাদেশে আমদানি বাণিজ্য এক গভীর স্থবিরতার সংকেতে পৌঁছেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সদ্যপ্রকাশিত পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালের জুন মাসে আমদানি ঋণপত্র (এলসি) খোলার পরিমাণ গত প্রায় পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে নেমে এসেছে।

বিশেষজ্ঞরা এই প্রবণতাকে দেশের বিনিয়োগ স্থবিরতা, মূল্যস্ফীতি ও মজুরি বৃদ্ধির ভারসাম্যহীনতা, এবং ভোক্তা ব্যয়ের ধারাবাহিক হ্রাসের ফলাফল হিসেবে চিহ্নিত করছেন। ব্যাংকারদের মতে, আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য এমন হ্রাস গভীর অর্থনৈতিক সংকটের পূর্বাভাস দিচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুসারে, ২০২৫ সালের জুন মাসে আমদানি এলসি খোলা হয়েছে মাত্র ৪.১৪ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৪ সালের জুনের তুলনায় ২৪.৪২ শতাংশ কম। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সর্বশেষ এর চেয়ে কম এলসি খোলা হয়েছিল ২০২০ সালের আগস্টে, অর্থাৎ কোভিড মহামারির শুরুর সময়—তখন এলসির পরিমাণ ছিল ৩.৭ বিলিয়ন ডলার। এ বছরের প্রথম ছয় মাসজুড়েই এলসি খোলার গতি ধীর হতে দেখা যায়, যার চূড়ান্ত প্রতিফলন ঘটে জুনে।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, “আমদানিকারকেরা এখন আর আগের মতো পণ্য আনছেন না, কারণ বাজারে চাহিদাই নেই। সরকারিভাবেও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি খুব কম, ফলে প্রয়োজনীয় সামগ্রী আমদানির চাহিদাও কমে গেছে।”

ব্যাংকার ও বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এই সংকোচন শুধু অর্থনৈতিক শ্লথতা নয়, বরং ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তার ইঙ্গিতও বহন করে। দীর্ঘ মেয়াদে এর প্রভাব পড়বে রাজস্ব আয়, রপ্তানি উৎপাদন, ও ব্যাংক খাতের লভ্যাংশে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধে বিনিয়োগ-সম্পর্কিত পণ্যের এলসি খোলায় বড় ধস লক্ষ্য করা গেছে। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি আগের বছরের তুলনায় ২৫ শতাংশের বেশি কমেছে। একই সময়ে মধ্যবর্তী পণ্য, পেট্রোলিয়াম, ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানির এলসিও উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এসব সূচকের পতন অর্থনীতির মোট গতি ও ভবিষ্যত প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা সম্পর্কে নেতিবাচক বার্তা দেয়।

জুনে এলসি নিষ্পত্তির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪.৫৯ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ১৪ শতাংশ কম। এরচেয়ে কম নিষ্পত্তি সর্বশেষ দেখা গিয়েছিল ২০২০ সালের নভেম্বর মাসে—৪.৪১ বিলিয়ন ডলার। তবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরজুড়ে এলসি নিষ্পত্তির পরিমাণ সামান্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৯.৪৬ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২২-২৩ সালের তুলনায় ৪.১৮ শতাংশ বেশি।

জুনে আমদানি কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়ে ডলারের চাহিদায়। বাজারে অতিরিক্ত তারল্য তৈরি হওয়ায় জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে ডলারের দাম প্রায় ৩ টাকা কমে দাঁড়ায় ১২০ টাকায়। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নিলামের মাধ্যমে ডলার কিনে বাজারে হস্তক্ষেপ করে। ১৩ জুলাই কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১২১.৫০ টাকা দরে ১৭৩ মিলিয়ন ডলার কেনে। ১৫ জুলাই আরও ৩৭৩ মিলিয়ন ডলার এবং পরবর্তী একটি নিলামে ১০ মিলিয়ন ডলার কেনার মাধ্যমে বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরানোর চেষ্টা চালানো হয়। এই হস্তক্ষেপের ফলে ডলারের দরপতন থেমে যায়, এবং পুনরায় ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা শুরু হয়। ২৭ জুলাই ডলারের আন্তঃব্যাংক দাম দাঁড়ায় ১২২.৫০ থেকে ১২২.৮৩ টাকা।

আরেক ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী বলেন, “বর্তমানে দেশে কার্যত নতুন বিনিয়োগ নেই। বিনিয়োগ না থাকলে মেশিন, যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল কিছুই আমদানি হয় না। এখন যে সামান্য আমদানি হচ্ছে, তার বড় অংশই ভোগ্যপণ্য, যেগুলোর আমদানি প্রায় স্থিতিশীল।”

জুনে এলসি খোলা ও নিষ্পত্তির হার নাটকীয়ভাবে হ্রাস পাওয়া বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক গুরুতর বার্তা দেয়। এটি শুধু বৈদেশিক বাণিজ্য নয়, বরং দেশের ভোগব্যয়, বিনিয়োগ, রাজস্ব, এবং ডলার বাজার—সবকিছুর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এই প্রেক্ষাপটে অর্থনীতিবিদরা দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। সরকারকে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যৌথ আলোচনায় বসে সমস্যাগুলোর সমাধান, স্থিতিশীল নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিতকরণ এবং বিনিয়োগ উৎসাহিত করার উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা। 
অকা/প্র/ই/সকাল/২৮ জুলাই, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 11 months আগে

Leave A Reply

Exit mobile version