অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
দেশের ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো (এনবিএফআই) আমানতকারীর সংখ্যা কমছে। চলতি বছরের জুন প্রান্তিকে আরও ৪৭ হাজার ৬০৪ আমানতকারী হারিয়েছে। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে প্রতি প্রান্তিকেই আমানতকারীর সংখ্যা কমার ধারা অব্যাহত রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২১ সালের জুনের শেষে এনবিএফআই খাতে আমানতকারীর সংখ্যা ছিল ৭,৬২ লাখ। কিন্তু তিন মাসের মধ্যে, একই বছরের সেপ্টেম্বরে, সংখ্যাটি প্রায় সাড়ে ৫ লাখ কমে ২.১০ লাখে পৌঁছে।
তারপর এক বছরের মতো আমানতকারী বাড়ার প্রবণতা ছিল। তবে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরের পর থেকে এ পর্যন্ত প্রতি প্রান্তিকেই আমানতকারী কমেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, অনেক এনবিএফআইয়ে দুর্নীতি, অনিয়ম ও সুশাসন না থাকায় জনগণের আস্থাহীন কমে গেছে। এর জেরে এ খাতে কমেছে ছোট আমানতকারীর সংখ্যা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদন অনুসারে, চলতি বছরের জুন শেষে দেশের ৩৫টি এনবিএফআইয়ের আমানতকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩.৮০ লাখ। মার্চ শেষে এর পরিমাণ ছিল ৪.২৭ লাখ।
বাংলাদেশ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানির (বিডি ফাইন্যান্স) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাইসার হামিদ বলেন, 'আমাদের খাতে অনেক অ্যাকাউন্ট আছে যেগুলো ডিপিএস (ডিপোজিট পেনশন স্কিম) বা ছোট আমানত। এই অ্যাকাউন্টগুলোর সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণে ডিপোজিট অ্যাকাউন্টের সংখ্যা কমে যেতে পারে।'
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে এনবিএফআইগুলোতে মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজার ১১৬ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই প্রান্তিকের তুলনায় ১ শতাংশ বেশি। মার্চ প্রান্তিকের তুলনায় জুন প্রান্তিকে আমানতের পরিমাণ ৮০০ কোটি টাকা বেড়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, হাতেগোনা ভালো কয়েকটি এনবিএফআইয়ে আমানত ও গ্রাহক কমবেশি বাড়ছে। 'তবে এগুলো বাদে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানেরই অবস্থা ভালো নয়। ফলে গ্রাহকেরা সেখানে নতুন করে ডিপোজিট রাখছেন না। উল্টো তাদের ডিপোজিটের টাকা তুলে নিচ্ছেন।'
তিনি আরও বলেন, 'অনেক প্রতিষ্ঠান এমনও আছে, যারা কয়েক বছর ধরে গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিতে পারছে না। এছাড়া মূল্যস্ফীতি অনেক বেশি বেড়ে যাওয়ায় অনেক গ্রাহক দৈনন্দিন খরচ মেটাতে আমানত তুলে নিচ্ছেন।'
ঋণ বিতরণে অনিয়ম এবং সুশাসনের অভাব থাকায় অধিকাংশ এনবিএফআই ধুঁকছে বলে মন্তব্য করেন এই কর্মকর্তা।
২০২১ সালে গ্রাহক সংখ্যায় বড় পরিবর্তন প্রসঙ্গে সিলিঙ্ক অ্যাডভাইজরির প্রতিষ্ঠাতা এবং আইপিডিসি ফাইন্যান্সের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মমিনুল ইসলাম বলেন, 'আমি আইপিডিসিতে থাকাকালীন বেশ কয়েক বছর আগে একটি মোবাইল ফাইন্যান্স সার্ভিস (এমএফএস) প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একটা ডিপিএস ক্যাম্পেইন করেছিলাম।
'তখন কয়েক লাখ নতুন ডিপিএফ অ্যাকাউন্ট তৈরি হয়েছিল। আমাদের ভাবনা ছিল, এসব গ্রাহকদের মধ্যে অন্তত ১০-১৫ শতাংশ আইপিডিসির স্থায়ী গ্রাহক তৈরি হবে। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে তা হয়নি। মূলত এই ধরনের ক্যাম্পেইনগুলো শেষ হয়ে যাওয়ার পর গ্রাহকসংখ্যায় বড় পরিবর্তন হয়।'
কোভিড-পরবর্তী সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অতি রক্ষণশীল মনোভাবের কারণে দেশের এনবিএফআই খাতের অবস্থা ক্রমাগত খারাপ হচ্ছে মন্তব্য করে এই আর্থিক খাত বিশেষজ্ঞ বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের করে দেওয়া কিছু নীতিমালার কারণে এখন যেসব প্রতিষ্ঠান ভালো আছে, তাদের পক্ষেও টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
'এনবিএফআই খাতকে টিকিয়ে রাখতে গেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এসব নীতিমালার পরিবর্তন নিয়ে আসা উচিত,' বলেন মমিনুল।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের জুন শেষে এনবিএফআইগুলোতে কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা অ্যাকাউন্টের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ২২৮টি। মার্চ শেষে এমন অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ২০৪টি। অর্থাৎ তিন মাসে কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা অ্যাকাউন্টের সংখ্যা বেড়েছে মাত্র ২৪টি। ●
অকা/আপ্র/ই/সকাল, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 2 years আগে

