অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
ঈদুল আজহা উপলক্ষে ঘোষিত টানা দশ দিনের সরকারি ছুটি চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রমে কার্যত অচলাবস্থার সৃষ্টি করেছে। ৫ জুন থেকে শুরু হয়ে ১৪ জুন পর্যন্ত চলমান এই ছুটিতে কনটেইনার ওঠানামা ও ডেলিভারি প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমে এসেছে। ফলে আমদানি-রফতানি বাণিজ্য চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং ব্যবসায়ীরা পড়েছেন আর্থিক ক্ষতির মুখে।
বন্দরের পরিসংখ্যান বলছে, ৮ জুন কোনো কনটেইনারই ডেলিভারি হয়নি। ৭ জুন মাত্র ৫২১ টিইইউ (বিশ ফুট সমতুল্য ইউনিট) কনটেইনার ডেলিভারি হয়েছে, যেখানে স্বাভাবিক সময়ে এই সংখ্যা ৫ হাজারের বেশি থাকে। ৯ জুন তা ছিল মাত্র ৪৩৭ টিইইউ, আর ১০ জুন ১ হাজার ৩৮১ টিইইউ। অর্থাৎ, ছুটির মধ্যে দৈনিক ডেলিভারি ৮০ শতাংশের বেশি কমে গেছে।
একই চিত্র দেখা গেছে আমদানি কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়েও। ৬ জুন ৫ হাজার ৫৪৪ টিইইউ কনটেইনার নামানো গেলেও ৮ জুন তা নেমে আসে ৩০৮ টিইইউতে। শ্রমিক সংকট, লজিস্টিক সাপোর্ট ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর বন্ধ থাকার কারণে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে বলে জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
বেসরকারি ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোগুলো (আইসিডি) সময়মতো কনটেইনার সরবরাহ করতে না পারায় এবং শ্রমিক সংকটে জর্জরিত বন্দরে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রফতানি পণ্যবাহী কনটেইনার জাহাজে ওঠানো যায়নি। সাইফ পাওয়ারটেকের নির্বাহী পরিচালক নাজমুল হক জানান, “এই কারণে ৩০ শতাংশ রফতানি কনটেইনার নির্ধারিত শিডিউলে তোলা সম্ভব হয়নি। এসব কনটেইনার দুই দিন পরে ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরের উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়।”
বিকডা (বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশন) এর তথ্যমতে, প্রতিদিন গড়ে ২,২০০ টিইইউ রফতানি কনটেইনার জাহাজে ওঠানো হয়, কিন্তু ঈদের ছুটিতে শ্রমিক সংকটে এ হার মারাত্মকভাবে কমে গেছে।
এই সংকটকালেই চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ স্টোরেজ চার্জ চারগুণ বৃদ্ধি করায় ব্যবসায়ীদের ক্ষতির মাত্রা আরও বেড়েছে। বর্তমানে একটি ২০ ফুট কনটেইনারের জন্য প্রতিদিন ২৪ থেকে ৯৬ ডলার এবং ৪০ ফুট কনটেইনারের জন্য ৪৮ থেকে ১৯২ ডলার পর্যন্ত চার্জ গুনতে হচ্ছে, যেখানে আগে তা ছিল যথাক্রমে ৬ ও ১২ ডলার।
বাংলাদেশ ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি মোহাম্মদ বেলাল বলেন, “এই চারগুণ রেন্ট দেশের অর্থনীতির জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। বন্দরের কার্যক্রম সীমিত থাকার সময় ব্যবসায়ীদের স্টোর রেন্ট দিয়ে শাস্তি দেওয়া অন্যায়।”
বিকেএমইএ’র পরিচালক সামছুল আজম বলেন, “রফতানিমুখী পোশাক খাত এই মুহূর্তে সংকটে রয়েছে। কাঁচামাল ছাড়ে বাড়তি খরচ এই শিল্পের প্রতিযোগিতামূল অবস্থানকে দুর্বল করে দিচ্ছে। এই চারগুণ চার্জ অবিলম্বে প্রত্যাহার করা উচিত।”
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের মুখপাত্র চিফ পারসোনাল অফিসার নাসির উদ্দিন দাবি করেছেন, “বন্দরে সব কার্যক্রম চালু আছে এবং ডেলিভারির জন্য সব প্রস্তুতি রয়েছে।” তবে ব্যবসায়ীদের দাবি, কাস্টমস, ব্যাংক, ট্রান্সপোর্ট ও আইসিডি—যেসব প্রতিষ্ঠান একযোগে না খোলা থাকে, তখন কেবল বন্দর সচল রাখলে কার্যক্রম স্বাভাবিক হয় না।
চিটাগং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, “সব ব্যবসায়ীর ওপর চারগুণ রেন্ট চাপিয়ে দেওয়া অন্যায়। যিনি ইচ্ছাকৃতভাবে ডেলিভারি নেননি, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু সামগ্রিক সংকটের দায় ব্যবসায়ীদের ওপর চাপানো অনুচিত।”
১০ জুন পর্যন্ত বন্দর ইয়ার্ডে ৩৮ হাজার ৫২ টিইইউ কনটেইনার জমা হয়, যেখানে সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা ৫৩ হাজার ৫১৮ টিইইউ। তবে কার্যকর পরিচালনার জন্য ৩০-৩৫ হাজার টিইইউ ধারণই আদর্শ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। ফলে কনটেইনার জট এবং ধীরগতির শিপমেন্ট পরিস্থিতি আগামী সপ্তাহেও অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঈদের মতো দীর্ঘ ছুটির সময় বন্দর এবং সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠান সুনির্দিষ্ট সময়সূচি ও সমন্বয়ে চালু রাখার জন্য একটি স্থায়ী নীতিমালা থাকা উচিত। একইসাথে, সংকটকালীন সময়ে চারগুণ স্টোরেজ ভাড়ার মতো অযাচিত আর্থিক চাপ যেন ব্যবসায়ীদের ওপর না পড়ে, সে বিষয়ে বন্দরের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি। ●
অকা/প্র/ই/সকাল/১২ জুন, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 12 months আগে

