অর্থকাগজ প্রতিবেদন
২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাই বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য কিছুটা আশার বার্তা বয়ে এনেছে। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) প্রকাশিত মাসিক অর্থনৈতিক হালনাগাদে বলা হয়েছে, অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষণ দেখা দিলেও সামগ্রিক চিত্র এখনো সতর্কতা দাবি করে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মূল্যস্ফীতির ধারা কিছুটা নিচের দিকে নামছে, রফতানি আয়ের গতি ফিরে আসছে এবং রেমিট্যান্সে ইতিবাচক গতি আছে—যা অর্থনীতির বহিরাঙ্গিক খাতকে কিছুটা স্থিতিশীল রাখছে। তবে বিনিয়োগ ও শিল্পখাতের স্থবিরতা, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য উত্তেজনা বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের পালটা শুল্ক নীতির সম্ভাব্য চাপ বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধিকে সীমিত রাখছে।

বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২৬) প্রবৃদ্ধির হার ৩.৩ থেকে ৪.১ শতাংশ এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ৩.৯ শতাংশ অনুমান করছে। আগামী অর্থবছর, অর্থাৎ ২০২৬-এ এই হার ৫.১ থেকে ৫.৩ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে তারা। অর্থাৎ অর্থনীতি এখনো সংকট কাটিয়ে ওঠার লড়াইয়ে রয়েছে।

মূল্যস্ফীতি গত কয়েক মাসে কিছুটা হ্রাস পেলেও চালের দাম ক্রমাগত বেড়ে চলেছে, যা দুশ্চিন্তার বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফসল তোলার পর ক্ষয়ক্ষতি, উচ্চ পরিবহন ব্যয়, এবং অনুমাননির্ভর মজুত—এসবকে চালের দাম বৃদ্ধির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে জরুরি সরবরাহ ব্যবস্থাপনা তদারকি জোরদারের সুপারিশ করেছে জিইডি।

অন্যদিকে, দেশের বাহ্যিক খাত কিছুটা ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। টাকার মান ডলারের তুলনায় সামান্য শক্তিশালী হয়েছে। রেমিট্যান্সে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি এবং পণ্য রপ্তানিতে ধীরে ধীরে গতি ফিরে আসছে। তবে রপ্তানির টেকসই পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করতে নতুন বাজারে প্রবেশ, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বৈচিত্র্যময় পণ্য প্রবর্তন অপরিহার্য।

জুন মাসে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি দেখা গেছে। এনবিআরের হিসাব অনুযায়ী, প্রস্তাবিত প্রশাসনিক পুনর্গঠনের কারণে মাসটির একটি সময় রাজস্ব সংগ্রহ কার্যক্রম স্থবির ছিল। জিইডি বলেছে, এই ঘাটতি কাভার করতে আগামী মাসগুলোতে কর প্রশাসনের গতিশীলতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে।

অর্থনীতির প্রাণশক্তি হিসেবে বিবেচিত ব্যাংকিং খাতও নানা চাপে রয়েছে। ছয় মাস ধরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশের নিচে অবস্থান করছে। এর পেছনে রয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কঠোর মুদ্রানীতি, এবং আমদানি অর্থায়নের হ্রাস। একই সঙ্গে, আমানতের প্রবৃদ্ধিও হ্রাস পাচ্ছে, যা ব্যাংকগুলোর ঋণ সক্ষমতাকে দুর্বল করছে।

মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকলেও এটি মাঝারি বিনিয়োগ গতিরই ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে জিইডি মনে করছে। বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রবাহের জন্য এখনও প্রত্যাশিত পরিবেশ তৈরি হয়নি।

প্রতিবেদনের এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তায় বলা হয়েছে, অর্থনীতিকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে হলে এখনই বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কার দরকার। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ

উৎপাদনে উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি সংযুক্তি

মানবসম্পদ উন্নয়নে বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা

জুলাইয়ে কিছু ইতিবাচক ইঙ্গিত অর্থনীতির গতি ফেরানোর আশা জাগালেও, বাস্তবতা বলছে, বাংলাদেশকে এখনই সিদ্ধান্তমূলক ও সাহসী অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নিতে হবে, নইলে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা অধরাই থেকে যাবে।
অকা/প্র/ই/সকাল/২৮ জুলাই, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 11 months আগে

Leave A Reply

Exit mobile version