অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
বাংলাদেশে উচ্চ পরিচালন ব্যয়ে জর্জরিত ব্যবসায়ীদের জন্য বড় ধরনের স্বস্তির বার্তা আসতে পারে আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যবসার পরিবেশ সহজ করার লক্ষ্যে আমদানিতে ভুল ঘোষণার (mis-declaration) ক্ষেত্রে কঠোর জরিমানা কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদি কর মামলায় সুদের সীমা নির্ধারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত বাজেটে আমদানি ঘোষণায় ভুলের জন্য ৪০০ শতাংশ পর্যন্ত আরোপযোগ্য জরিমানা কমিয়ে ২০০ শতাংশে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে, কর সংক্রান্ত মামলায় সুদের আরোপ সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত সীমিত করা হতে পারে। বর্তমানে এসব মামলায় ৮-১০ বছর ধরে সুদ আরোপের ফলে বিপুল আর্থিক বোঝার মুখে পড়ে ব্যবসায়ীরা, যার কারণে অনেক সময় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পদ বিক্রি করে কর পরিশোধ করতে হয়।
বর্তমানে আমদানির প্রাথমিক ঘোষণায় (IGM) ছোটখাটো ভুলের জন্যও কমপক্ষে ৫০ শতাংশ জরিমানা দিতে হয়। বাজেটের মাধ্যমে এ বিধান বাতিল করে কাস্টমস কমিশনারদের ভুলের গুরুত্ব অনুযায়ী জরিমানা নির্ধারণের সুযোগ দেওয়া হতে পারে। একইভাবে, আমদানি নীতি আদেশ (IPO) লঙ্ঘনের জন্য যেসব ক্ষেত্রে আমদানি করের সমপরিমাণ জরিমানা আরোপ করা হতো, তা এখন কমিশনারদের বিবেচনায় কমানোর সুযোগ থাকবে।
জাহাজ কোম্পানিগুলোর কার্গো ঘোষণায় ভুলের জন্য বর্তমানে ন্যূনতম ৫০ হাজার টাকার জরিমানা রয়েছে, যা বাতিল করে নামমাত্র জরিমানার বিধান আনার চিন্তা রয়েছে। বই ও ম্যাগাজিনের মতো পণ্যে শুল্কমুক্ত আমদানির সীমা ২ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪ হাজার টাকা করার প্রস্তাবও বিবেচনায় রয়েছে।
বাজেট প্রস্তাবে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হতে যাচ্ছে পণ্যের মূল্য নির্ধারণে আমদানিকারকের ঘোষিত মূল্যকে প্রাধান্য দেওয়া। দীর্ঘদিন ধরে কাস্টমস কর্মকর্তাদের নিজস্ব মূল্য নির্ধারণ ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ করে আসছিল ব্যবসায়ীরা। এবার সেই অভিযোগের জবাবে আমদানিকারকের ঘোষিত মূল্যে ভিত্তি করে কর নির্ধারণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, যা ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের দাবি।
এসব সংস্কারের খসড়া খবরে শিল্প নেতারা স্বস্তির শ্বাস ফেলছেন। ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (FICCI)-এর সভাপতি জাভেদ আখতার বলেন, ‘এগুলো ব্যবসা-বান্ধব প্রগতিশীল উদ্যোগ। নিয়ন্ত্রকদের উচিত শুধু নজরদারির ভূমিকা না রেখে সহযোগিতামূলক মনোভাব নিয়ে এগোনো।’ তিনি আরও বলেন, ‘ব্যবসা সহজ করতে খাতভিত্তিক অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ, অপ্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন এবং নন-অবজেকশন সার্টিফিকেট নেওয়ার বাধ্যবাধকতা কমানো দরকার।’
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)-এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘বন্ড সুবিধাপ্রাপ্ত রপ্তানিকারকদের জন্য ২০০ শতাংশ জরিমানাও এখনো অতিরিক্ত। অনেক সময় সামান্য এইচএস কোড ভিন্নতার কারণে বড় অঙ্কের জরিমানার মুখে পড়তে হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘মিথ্যা ঘোষণার নাম করে প্রকৃত রপ্তানিকারকরা যেন জরিমানার শিকার না হন, সে বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ দরকার।’
যদিও এনবিআরের শীর্ষ কর্মকর্তারা এসব সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছেন, তবে কিছু কর্মকর্তা সতর্কবার্তাও দিয়েছেন। একজন ভ্যাট কমিশনার বলেন, কর মামলার সুদ সীমিত করা হলে কিছু ব্যবসায়ী কৌশলে মামলার নিষ্পত্তি দীর্ঘায়িত করে সুদের বোঝা হ্রাস করার চেষ্টা করতে পারে। এতে সরকার রাজস্বের সময়মূল্য (time value of money) অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ কারণেই এমন একটি কাঠামো দরকার যা প্রকৃত ফাঁকিবাজদের শনাক্ত করে শাস্তির আওতায় আনবে।
সব মিলিয়ে, প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যবসার ব্যয় কমানো এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে নেওয়া এসব পদক্ষেপ ব্যবসায়ী মহলের দীর্ঘদিনের দাবির প্রতিফলন। তবে বাস্তবায়নে কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে এসব উদ্যোগের সুফল পুরোপুরি আসবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ব্যবসায়ীদের স্বস্তির পাশাপাশি রাজস্ব আদায়ে ভারসাম্য রক্ষা করাও এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে সরকারের সামনে। ●
অকা/প্র/ই/ সকাল/২৯ মে, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 1 year আগে

