অর্থকাগজ প্রতিবেদন

রফতানিতে আর থাকছে না নগদ সহায়তা বা ক্যাশ ইনসেনটিভ। আগামী ২০২৬ সালের মধ্যে এ সুবিধা পর্যায়ক্রমে তুলে নিতে চায় সরকার। তার বদলে দেয়া হবে অন্য কোনো সহায়তা। আড়াই দশক ধরে চলে আসা সুবিধাটি বাতিল হলে বিকল্প কী ধরনের সহায়তা দেয়া যায়, এখন খোঁজা হচ্ছে তার উপায়। অর্থ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে এ তথ্য।

সূত্রগুলো জানায়, নগদ সহায়তা বাতিল হলে রফতানিতে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে কি না, তা নিয়ে একটি সমীক্ষা করছে অর্থ মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি বিকল্প সুবিধাগুলো কী হতে পারে, কাজ করছে সেটি নিয়েও। এ ক্ষেত্রে পরিবহন এবং সেচকাজে জ্বালানি খরচ কমানো বা অন্য কোনো সুবিধা দেয়া যায় কি না, ভাবা হচ্ছে সেটিও।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত অর্থবছরে রফতানিতে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা নগদ সহায়তা দেয়া হয়। ওই অর্থবছরে মোট রফতানি আয় ছিল পাঁচ হাজার ২০০ কোটি ডলার। বর্তমান বিনিময় হারে যা প্রায় পাঁচ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে তৈরি পোশাক শিল্পের অবদান ৪ হাজার ২৬৭ কোটি ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ৪২টি খাত সর্বনিম্ন ১ থেকে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ হারে নগদ সহায়তা পাচ্ছে। রফতানি আয়ের এফ ও বি (ফ্রেইট অন বোট) মূল্যের বিপরীতে উল্লিখিত হারে নগদ সহায়তা দেয়া হয়।

প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ অনেক দেশেই রফতানিতে নগদ সহায়তা দেয়া হয় না। সেই পথেই হাঁটছে বাংলাদেশও। বিশেষ করে ভারত ও ভিয়েতনামে বিকল্প কী ধরনের সুবিধা দেয়া হচ্ছে, তা পরীক্ষা করে দেখছে সরকার।

সূত্র জানায়, নগদ সহায়তা বাতিল হলে দেশীয় রফতানি খাতে কী ধরনের সম্ভাব্য ঝুঁকি আসতে পারে তা নিয়ে একটি সমীক্ষা করছে অর্থ মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি বিকল্প সুবিধা দেয়ার বিষয়টি নিয়েও কাজ চলছে।

সব কিছু ঠিক থাকলে ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশ বা এলডিসি তকমা কাটিয়ে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পাবে বাংলাদেশ। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডাব্লিউটিও) নিয়ম অনুযায়ী, উন্নয়নশীল দেশ হলে তখন আর রফতানিতে নগদ সহায়তা কিংবা ভতুর্কি দেয়া যায় না। সংস্থাটির সদস্য হওয়ায় এ নিয়ম মানার বাধ্যবাধকতা রয়েছে বাংলাদেশের। মূলত এ কারণেই নগদ সহায়তা উঠিয়ে দিতে চায় সরকার।

এলডিসি থেকে বের হতে পারলে উজ্জ্বল হবে দেশের ভাবমূর্তি। ক্রেডিট রেটিং উন্নত হওয়ায় সহজ হবে বিদেশি ঋণ পাওয়া। বাড়বে সরাসরি বিদেশি বিনিযোগ বা এফডিআইও। তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জ রফতানি খাতে। উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের ফলে বিশ্ববাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে না বাংলাদেশ। এতে তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়বে রফতানি আয়।

যদিও এ নিয়ে উদ্বিগ্ন নন স্থানীয় রফতানিকারকরা। তারা বলেছেন, বাংলাদেশের বড় বাজার হচ্ছে ইউরোপ। সেখানে ২০২৯ সাল পর্যন্ত শুল্কসুবিধা পাবে বাংলাদেশ। লম্বা সময় আছে প্রস্তুতি নেয়ার। আর যুক্তরাষ্ট্রে অন্যান্য দেশের সঙ্গে প্রযোজ্য হারে শুল্ক দিয়ে রফতানি করছে বাংলাদেশ। কাজেই উত্তরণ-পরবর্তী রফতানি খাত নিয়ে বাংলাদেশের কোনো ভয় নেই।

তবে কিছুটা সমস্যায় পড়তে পারে জাপান, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা ভারতের বাজারে। এসব দেশে শুল্কমুক্ত সুবিধা পায় বাংলাদেশ।

তৈরি পোশাক রফতানিকারক মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সহসভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, ‘নগদ সহায়তা প্রত্যাহার হওয়া নিয়ে আমরা শঙ্কিত নই।’ তবে তার দাবি, রফতানি ব্যাহত করে এমন বাধাগুলো দূর করার পাশাপাশি কমাতে হবে ব্যবসার খরচ এবং আমদানি-রফতানি প্রক্রিয়ায় ঘুষ-দুর্নীতি।

বিজিএমইএর সহসভাপতি শহীদুল্লাহ আজিমও মনে করেন, নগদ সহায়তা না থাকলে ভয়ের কিছু নেই। তিনি বলেন, ‘আমরা প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছি। উচ্চ মূল্যের পোশাক বানানোর দিকে বেশি জোর দেয়া হচ্ছে। পণ্যের বৈচিত্র্যতা আর মূল্যসংযোজন বাড়াতে পারলে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা কঠিন হবে না।'

যোগাযোগ করা হলে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সাবেক কর্মকর্তা ও গবেষণা সংস্থা পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, নগদ সহায়তা উঠে গেলে পোশাক খাতের অসুবিধা হবে না। তবে আরও কিছু খাত আছে, যেগুলো বেশি হারে সুবিধা পাচ্ছে সে সব খাতে প্রভাব পড়তে পারে। এ জন্য ডাব্লিউটিওর সঙ্গে সামাঞ্জস্য রেখে ‘পরোক্ষ সুবিধা’ দেয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, নগদ সহায়তা দেয়ার ফলে রফতানিতে কতটুক সুবিধা পাচ্ছে এবং তা প্রত্যাহার করে নিলে কী ধরনের প্রভাব পড়বে তার বিশদ বিশ্লেষণ দরকার।

তিনি বলেন, ‘অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশ তাদের শিল্পকে রক্ষায় বিদ্যমান সুবিধার বাইরে বিকল্প সাপোর্ট দিয়ে আসছে। বাংলাদেশকেও এ ধরনের বিকল্প সুবিধা দিতে হবে। এ জন্য বিস্তারিত বিশ্লেষণ দরকার, যার ওপর ভিত্তি করে ভবিষ্যতে সরকার সিদ্ধান্ত নিতে পারে বলে জানান তিনি।

রফতানিকে উৎসাহিত করতে পোশাকসহ অন্যান্য খাতে ১৯৯০ সাল থেকে নগদ সহায়তা দিয়ে আসছে সরকার।
#

অকা/ প্র/ দুপুর, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 4 years আগে

Leave A Reply

Exit mobile version