অর্থকাগজ প্রতিবেদন

সয়াবিনের তেজে জ্বলছে সরিষাও। সয়াবিন তেলের ঊর্ধ্বগতির মধ্যে সরিষার তেলের খোঁজ করতে গিয়ে এই তেলের দামও হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়ার তথ্য মিলল। বিক্রেতারা বলছেন, সয়াবিন তেলের দাম বাড়ার কারণে বিকল্প পণ্য হিসেবে বেড়েছে এই তেলের দাম।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কেরানীগঞ্জের আটিবাজার এলাকায় চারটি তেলের ঘানি রয়েছে, যেখান থেকে ঢাকার বাসিন্দারাও তেল কিনতে যান।

এক সপ্তাহ আগেও এখানে ১৭০ টাকা লিটার দরে তেল বিক্রি হতো এসব ঘানিতে। সয়াবিন তেল নিয়ে শোরগোলের মধ্যে এক লিটারে ৩০ টাকা বেড়ে দাম হয়ে গেছে ২০০ টাকা।

তেল বিক্রেতারা জানান, এক সপ্তাহের ব্যবধানে সয়াবিন তেল টেনে তুলছে সরিষার তেলের দাম।

ঘানি ভাঙা এই তেলের দাম লিটারে ২০০ টাকা হলেও বাজারে বোতলজাত কোম্পানিগুলোর তেলের লিটার বিক্রি হচ্ছে ২৯০ থেকে ৩০০ টাকায়। ছয় মাস আগেও এই তেল ২২০ থেকে ২৫০ টাকার আশপাশে ছিল।

ক্রেতারা বলছেন, সয়াবিন তেলের দাম বাড়ছে, তাই সরিষার তেলের দামও বাড়িয়েছে। তেলের দোকানি জানিয়েছেন, সরিষার দাম বাড়ার কারণে তেলের দাম বাড়িয়েছে।’

করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার পর বিশ্বজুড়ে পণ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রভাব পড়েছে দেশেও। প্রায় সব নিত্যপণের দামই এখন ঊর্ধ্বমুখী। এর মধ্যে সয়াবিন তেলের দাম নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে।

এই সেদিন ৬ ফেব্রুয়ারি তেলের দাম লিটারে বাড়ানো হয়েছে ৮ টাকা। এক মাস যেতে না যেতেই ১ মার্চ থেকে আরও ১২ টাকা বাড়িয়ে লিটারে ১৮০ টাকা করতে চেয়েছিলেন ব্যবসায়ীরা। সরকার রাজি না হওয়ায় বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দেয়া হয়েছে। বোতলজাত তেল চাহিদামতো পাওয়া যাচ্ছে না। বাজারে তেল কিনতে গেলে অন্য পণ্য কিনতে বাধ্য করার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। আবার খোলা তেলের দাম বেড়ে গেছে, এমনকি বিক্রি না করার অভিযোগও আসছে।

সয়াবিন তেলের ঊর্ধ্বগতির মধ্যে সরিষার তেলের বাজারের পরিস্থিতির খোঁজ করতে গিয়ে এই তেলের দামও হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়ার তথ্য মিলল। বিক্রেতারা বলছেন, সয়াবিন তেলের দাম বাড়ার কারণে বিকল্প পণ্য হিসেবে বেড়েছে এই তেলের দাম।

সয়াবিন তেলের বাজার পুরোটাই আমদানিনির্ভর। তবে সরিষার তেল সিংহভাগ ক্ষেত্রেই স্থানীয়ভাবে উৎপাদন হয়। এই তেলে কেন সয়াবিনের প্রভাব পড়বে- এমন প্রশ্নে ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংগঠন কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, ‘সয়াবিনের মতো একই কাজে ব্যবহার হয় সরিষার তেল। এ জন্য একটার দাম বাড়লে অন্যটার বাড়বে- এটা অস্বাভাবিক নয়। তাই আমরা ভোক্তারা বিপাকে। আমরা বড় অসহায় অবস্থায় আছি।’

তাই বলে সয়াবিনের মতো একই হারে কি সরিষার তেলের দাম বাড়া উচিত ছিল- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘যারা ব্যবসা করেন, তারা তো আর ধর্মের কথা শোনে না। ওরা লাভের কথা শোনে। সুযোগ পেলে লাভের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়।’

সরিষার দাম বৃদ্ধির দাবি

আটিবাজার এলাকায় যে চারটি সরিষার তেলের ঘানি দেখা যায় তার মধ্যে ‘খাঁটি তেল ঘর’-এর বিক্রি বেশি। সব সময় সেখানে মানুষ আনাগোনা দেখা যায়।

এই ঘানির মালিকের ভাগ্নে মো. আজাদ এখন জয়পুরহাটে আছেন সরিষা কেনার জন্য। তিনি বলেন, ‘সরিষার দাম এখন ৩ হাজার ৬০০ থেকে ৩ হাজার ৭০০ টাকা মণ। আগে কিনতাম ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায়।

‘পাঁচ দিন আগে তেল বিক্রি করতাম ১৭০ টাকা লিটারে। সরিষার দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তেলের দাম বাড়িয়ে ২০০ টাকা লিটার করা হয়েছে।’

কেন সরিষার দাম বাড়ল- এমন প্রশ্নে আজাদ বলেন, ‘সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে, এই কারণে সরিষার দামও বেড়েছে।’

এই সময়ে সরিষার দাম বৃদ্ধি স্বাভাবিক নয়। কারণ শীত শেষে নতুন সরিষা বাজারে চলে এসেছে। বরং বাড়তি দাম এখন ধীরে ধীরে কমার কথা।’

কেবল আটিবাজারের সেই দোকান নয়, অনলাইনে যেসব পেজে সরিষার তেল বিক্রি করা হয়, সেগুলোতেও দাম বেড়েছে সমানতালে।

গত কয়েক বছরে অনলাইনে যেসব খাদ্যপণ্য জনপ্রিয় হয়েছে, তার একটি সরিষার তেল। দেশের নানা এলাকায় ঘানিতে ভাঙিয়ে ছোট ছোট উদ্যোক্তা এই তেল বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেন।

কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও এসব ছোট উদ্যোক্তা এখন সরিষা তেলের চাহিদার অনেকটাই পূরণ করেন, সেটি নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।

এই উদ্যোক্তাদের একজন জহিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, সয়াবিন তেল নিয়ে হুলুস্থুলের মধ্যে তারা আগের দামে সরিষার তেল দিতে পারছেন না। তিনি জানান, তারা এখন তেল বিক্রি করছেন ২৪০ টাকা দরে। দুই সপ্তাহ আগেও তেলের দাম ছিল ২০০ থেকে ২১০ টাকা।

কেন এই দাম বৃদ্ধি- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা যাদের কাছ থেকে কিনি, তারা বলেছে, সয়াবিন তেলের দাম বাড়ছে, তাই সরিষার তেলের দামও বাড়ছে।’

পেজের পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট বিভিন্ন দোকান গড়ে উঠেছে, যেগুলোয় অর্গানিক পণ্য বিক্রি হয়। এসব দোকানের জনপ্রিয় পণ্যের একটি সরিষার তেল। এরাও ঘানি থেকে ভাঙানো তেল কনটেইনারে করে এনে এক বা দুই লিটার হিসেবে বিক্রি করেন।

রাজধানীর নিকুঞ্জ এলাকার ‘মৌসুমি অরগানিক’ দোকানের মালিক মো. আলম বলেন, ‘এক সপ্তাহ ধরে এই তেলের দাম বেড়েছে। আগে ২০০ লিটার বিক্রি করতাম। এখন ২২০ টাকা দরে বিক্রি করি।’

দাম বদ্ধির কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সরিষার দাম বেড়েছে, তাই তেলের দাম বেশি। আবার সরিষার ওপর সয়াবিনের ইফেক্ট পড়ছে। সয়াবিন তেলের দাম বৃদ্ধিতে সয়াবিনের সঙ্গে তুলনা করে সরিষার তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে।’

বাড্ডা এলাকার মুদি দোকানি মো. ফরিদ বলেন, ‘খোলা সরিষার তেল অনেক আগে কেনা ছিল আমার। তাই ২০০ টাকা লিটার বিক্রি করছি এখন। তবে এখন কিনে বিক্রি করতে গেলে ২২০ টাকা করতে হবে। তীর, রাঁধুনি ও প্রাণ কোম্পানির বোতলজাত সরিষার তেলের লিটার বিক্রি হচ্ছে ২৯০ টাকা।’

#

অকা/পবা/ দুপুর, ৫ মার্চ, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 4 years আগে

Leave A Reply

Exit mobile version