অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
ক্ষুদ্রঋণ খাতে তহবিল সংকট দূর হচ্ছে। বিধি পরিবর্তন করে দেয়া হয়েছে অবারিত সুযোগ। আগে প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট সঞ্চয়ের ১৫ ভাগ ব্যাংকে রাখার বাধ্যবাধকতা ছিল। তহবিল বাড়াতে এই নিয়ম শিথিল করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা মাইক্রো ক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ)। এখন ১০ ভাগ তারল্য রাখলেই চলবে।
মাইক্রো ক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি-২০১০ এর বেশকিছু ধারায় সংশোধনী এনে গেজেট জারি করা হয়েছে। তহবিলের জোগান ছাড়াও চারটি ধারায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের সুবাদে ক্ষুদ্রঋণ খাতে তহবিল কেনার ব্যয় কমবে দশমিক ২ শতাংশ। আর আগের চেয়ে তহবিলের জোগান বাড়বে ১৫ শতাংশ।
এমআরএর এক্সিকিউটিভ ভাইস চেয়ারম্যান মো. ফসিউল্লাহ বলেন, ‘বিধিমালায় পরিবর্তন আনাটা দীর্ঘদিনের দাবি ছিল। নতুন এই সিদ্ধান্তে ক্ষুদ্রঋণ খাতে বড় পরিবর্তন আসবে।’
প্রান্তিক মানুষদের অর্থায়নে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে বলে মনে করেন এনজিওদের জোট ক্রেডিট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফোরামের (সিডিএম) নির্বাহী পরিচালক আব্দুল আউয়াল। তিনি বলেন, তহবিল স্বল্পতায় কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ঋণ দেয়ার সক্ষমতা ছিল না। এমন সিদ্ধান্তে সেই খরা কিছুটা হলেও কাটবে।
এমআরএ আইনের বিধিমালায় পরিবর্তন এনে ২৫ সেপ্টেম্বর গেজেট জারি করেছে সরকার।
বিধিমালার ২২(২) অনুচ্ছেদে আগে ছিল, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের নামে স্থাবর সম্পত্তি কিনতে হবে। তাতে পরিবর্তন এনে করা হয়েছে পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনক্রমে, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের নামে স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি কেনা ও বিক্রি করা যাবে।
বিধি ২৪ (৩)-এ আগে ছিল উদ্যোগ ঋণের পরিমাণ প্রতিষ্ঠানের মোট ঋণস্থিতির অর্ধেকের বেশি হবে না। এমআরএ মূলত প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করে তার ঋণস্থিতির ওপর। এতে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটা কত বড় বা ছোট।
আগে বলা ছিল, উদ্যোগ ঋণের পরিমাণ মোট পোর্টফলিওর অর্ধেকের বেশি হবে না। এ ক্ষেত্রে এখন ৫০ ভাগের পরিবর্তে ৬০ ভাগ পর্যন্ত ঋণ নেয়ার সুযোগ দেয়া হয়েছে।
ক্ষুদ্রঋণের আকার এখন সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা। এর বেশি ঋণ দিলে তাকে বলে উদ্যোগ ঋণ। অথচ গ্রাহকরা বড় অঙ্কের ঋণ বেশি চায়।
উপবিধি-৬ এ একটি পরিবর্তন এনেছে এমআরএ। সাপ্তাহিক, পাক্ষিক এবং মাসিক ভিত্তিতে ঋণ ফেরত দেয় গ্রাহক। তবে এখন গ্রাহক ইচ্ছা করলে একটা ঋণ ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে ফেরত দিতে পারবে। আবার চাইলে সে ছয় মাস ভিত্তিতে পরিশোধ করতে পারবে। এককালীন পরিশোধেরও সুযোগ থাকবে।
ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমে তিন ধরনের আমানত নেয়ার সুযোগ দেয়া হয়েছে। তা হলো- বাধ্যতামূলক বা সাধারণ আমানত, স্বেচ্ছা আমানত ও মেয়াদি আমানত।
বিধি-২৮ সংশোধন করে এই বিধিতে স্বেচ্ছা আমানতের সুযোগ দেয়া হয়েছে। আগে বলা ছিল, কোনো প্রতিষ্ঠান যদি গ্রাহকের কাছ থেকে স্বেচ্ছা আমানত নিতে চায় তাহলে প্রতিষ্ঠানের বয়স হতে হবে ৫ বছর এবং শেষ তিন বছর প্রতিষ্ঠান লাভজনক হতে হবে।
এখন প্রতিষ্ঠানের বয়স ৫ বছর হলেই সে স্বেচ্ছা আমানত নিতে পারবে। যদি তিন বছর দুর্যোগকালীন হয় অথবা জাতীয় কোনো সংকট হয়, তাহলে প্রতিষ্ঠান সংকটকালীন সময় বা বছর বাদ দিয়ে হিসাব করতে পারবে।
স্বেচ্ছা আমানত হচ্ছে এমন ধরনের আমানত যেটা গ্রাহক যখন খুশি দেবে এবং যখন খুশি উত্তোলন করতে পারবে। যতদিন এই অর্থ জমা থাকবে, ততদিন নির্ধারিত হারে সুদ পরিশোধ করতে হবে।
বিধি-ঙতে বলা ছিল, গ্রাহক স্বেচ্ছা আমানত নিতে পারবে পুঁজির ২৫ ভাগ। এখন ৪০ ভাগ পর্যন্ত নেয়ার সুযোগ দেয়া হয়েছে।
পুঁজি বলতে যেটা বোঝায়, প্রতিষ্ঠানের ক্রমপুঞ্জিভূত উদ্বৃত্ত বা সংরক্ষিত তহবিল। অর্থাৎ তার ভালো ঋণের ১ ভাগ। তারপর তার ক্যাপিটাল ডোনেশন এবং প্রতিষ্ঠানের চাঁদা।
বিধি ২৯-এ স্বেচ্ছা আমানতের মতো মেয়াদি আমানত নেয়ার জন্য শর্তের পরিবর্তন আনা হয়েছে। বলা হয়েছে, একটি প্রতিষ্ঠানের বয়স হতে হবে ১০ বছর। তবে ১০ বছরের মধ্যে শেষ ৫ বছর তাকে লাভজনক হতে হবে।
৫ বছরের লাভের ক্ষেত্রে দুর্যোগের বিষয় নির্দিষ্ট করা ছিল না। এখন এই এটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মেয়াদি আমানত নেয়ার ক্ষেত্রে ২৫ ভাগের পরিবর্তে ৫০ ভাগ করা হয়েছে।
তহবিল বাড়ানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এনেছে এমআরএ। আগে একটি প্রতিষ্ঠানকে তার মোট সঞ্চয়ের ১৫ ভাগ ব্যাংকে জমা রাখতে হতো। এখন তারল্য হিসেবে ১০ ভাগ টাকা ব্যাংকে রাখলেই চলবে। বাকি ৯০ ভাগ টাকা ক্ষুদ্রঋণে ব্যবহার করা যাবে।
ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমে তহবিল সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। দুটি উৎস থেকে মূলত তহবিলের জোগান দেয়া হয়- ব্যাংক এবং পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন বা পিকেএসএফ।
এমআরএ বিধিতে সংশোধন আনায় তহবিল বাড়বে। বলা হচ্ছে, এই সুযোগ সৃষ্টির ফলে তহবিল কেনার ব্যয় কমবে দশমিক ২ ভাগ। আগের চেয়ে তহবিল জোগান বাড়বে ১৫ ভাগ।
ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত দেশের তিন কোটি ৩০ লাখ মানুষ। গ্রামীণ অর্থনীতির ৭৪ ভাগ অর্থের জোগান দেয় ক্ষুদ্রঋণ বা এমএফআই প্রতিষ্ঠানগুলো। মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে এই খাতের অবদান প্রায় ১৫ ভাগ। তহবিলের জোগান বাড়লে চাঙা হবে গ্রামীণ অর্থনীতি।
ক্রেডিট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফোরাম বা সিডিএমের নির্বাহী পরিচালক আব্দুল আউয়াল বলেন, ‘এনজিওগুলোর তহবিল জোগানের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে ব্যাংক, তবে সবসময় ব্যাংক অর্থের জোগান দেয় না। এতে চাহিদার বিপরীতে ঋণ দেয়া যেত না। এখন তহবিল বাড়লে ঋণ দেয়ার সুযোগ বাড়বে। এতে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের অর্থের খরা কিছুটা হলেও কাটবে।’
এনজিও কোস্ট ট্রাস্টের নির্বাহী পরিচালক রেজাউল করিম বলেন, ‘কোনো এনজিওতে গ্রাহকের এক লাখ টাকা সঞ্চয় হলে সেই গ্রাহক ৫ লাখ টাকা ঋণ দাবি করে, কিন্তু সেই চাহিদা এনজিওগুলো কীভাবে পূরণ করবে? এ ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।’
মো. ফসিউল্লাহ জানান, ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রমে বর্তমানে প্রতিদিন ৭০০ কোটি টাকার লেনদেন হয়। বছরে লেনদেনের পরিমাণ দুই লাখ কোটি টাকা। আর ক্ষুদ্রঋণে সঞ্চয়ের পরিমাণ ৫০ হাজার কোটি টাকা। নতুন এ সিদ্ধান্তে এই খাত আরও সম্প্রসারিত হবে।
#
অকা/প্র/ সকাল, ৩ অক্টোবর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 4 years আগে

