অর্থকাগজ প্রতিবেদন 

বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কায় অবকাঠামো খাতে শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা ভবিষ্যতে বড় ধরনের ঋণঝুঁকি তৈরি করতে পারে—এমন সতর্কবার্তা উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়। গবেষকদের মতে, দুর্নীতি, অস্বচ্ছ ক্রয়প্রক্রিয়া এবং অতিমূল্যায়িত মেগা প্রকল্প দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রীয় ঋণকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। আর্থিক চাপ অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই নীতিগত সংস্কার ও কঠোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

“Corruption in Infrastructure in Bangladesh and Sri Lanka: Implications for Public Debt” শীর্ষক গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন লন্ডনের SOAS University of London-এর গবেষকরা। এতে সহায়তা দিয়েছে Open Society Foundations এবং চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ। ঢাকায় Centre on Integrated Rural Development for Asia and the Pacific (CIRDAP) সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত এক সেমিনারে গবেষণাটি উপস্থাপন করা হয়।

উপস্থাপনায় অধ্যাপক Mushtaq Khan বলেন, অবকাঠামো চুক্তির দরে সামান্য বৃদ্ধি—যেমন প্রতি ইউনিটে কয়েক সেন্ট বেশি নির্ধারণ—প্রকল্পের পুরো আয়ুষ্কালে গিয়ে শত শত মিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত ব্যয়ে রূপ নিতে পারে। অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিদ্যুৎ বা বড় অবকাঠামো প্রকল্পে চুক্তিমূল্য সামান্য বাড়লেও ২০–২৫ বছরের সময়সীমায় এর সম্মিলিত প্রভাব কয়েক বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

গবেষণাটি অবকাঠামো বিনিয়োগে দুটি মৌলিক শাসনব্যবস্থাগত ব্যর্থতার কথা তুলে ধরেছে। প্রথমত, প্রকল্প কারিগরি দিক থেকে কার্যকর হলেও যদি অতিমূল্যে চুক্তি করা হয়, তবে অর্জিত রাজস্ব দিয়ে বিনিয়োগ ব্যয় পুনরুদ্ধার কঠিন হয়ে পড়ে। এতে ঋণের চাপ ধীরে ধীরে সঞ্চিত হয়ে অর্থনীতির ওপর ভারী বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। দ্বিতীয়ত, নকশাগত দুর্বলতা, নিম্নমানের নির্মাণ বা অপর্যাপ্ত পরিকল্পনার কারণে প্রকল্প প্রত্যাশিত উৎপাদন বা অর্থনৈতিক সুফল দিতে ব্যর্থ হলে—ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক ক্ষেত্রে এসব ব্যর্থতা কেবল প্রশাসনিক অদক্ষতার ফল নয়; বরং ক্রয়প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার, প্রতিযোগিতা সীমিতকরণ এবং রাজনৈতিক-ব্যবসায়ী আঁতাতের ফল বলেই গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

২০০৮–২০০৯ সালের পর উভয় দেশই অবকাঠামো-নির্ভর প্রবৃদ্ধি কৌশল গ্রহণ করে। শ্রীলঙ্কায় গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে সাবেক প্রেসিডেন্ট Mahinda Rajapaksa-এর আমলে বন্দর, সড়ক ও বিদ্যুৎ প্রকল্পে বিপুল বিনিয়োগ হয়। গবেষণা অনুযায়ী, দেশটির বৈদেশিক ঋণের প্রায় ৬৫ শতাংশ অবকাঠামো খাতে ব্যয় করা হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বেশ কিছু প্রকল্প আংশিক ব্যবহৃত বা আর্থিকভাবে অকার্যকর হিসেবে চিহ্নিত হয়, যা রাজস্ব আহরণে ব্যর্থ হয়ে ঋণসংকটকে ত্বরান্বিত করে।

বাংলাদেশেও একই সময়ে সড়ক, সেতু ও বিদ্যুৎ খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ হয়। ২০০৯ সালে দেশের বৈদেশিক ঋণ ছিল প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার; ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১১২ বিলিয়ন ডলারে। ঋণ পরিশোধে সুদের দায় এখন রাজস্ব বাজেটের ক্রমবর্ধমান অংশ গ্রাস করছে, যা আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

গবেষণায় দুটি নির্দিষ্ট প্রকল্পকে কেস স্টাডি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। শ্রীলঙ্কার মান্নার অঞ্চলের বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প, যেখানে ভারতের Adani Group সংশ্লিষ্ট ছিল, তা প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই এগিয়ে নেওয়া হয়। ২০২২ সালের Aragalaya গণআন্দোলনের সময় প্রকল্পটি তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে এবং ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটি সরে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভারতের ঝাড়খণ্ডে অবস্থিত আদানির গোড্ডা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আমদানিকৃত বিদ্যুতের বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। ১,৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন এ কেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুৎ ৯০ কিলোমিটার দীর্ঘ সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশে সরবরাহ করা হয়। সমন্বিত ট্যারিফ নির্ধারিত হয়েছে প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টা ৮.৬১ মার্কিন সেন্ট, যেখানে ভারতের অন্যান্য উৎস থেকে আমদানিকৃত বিদ্যুতের গড় দাম প্রায় ৪.৪৬ সেন্ট। গবেষকদের হিসাবে, এ ব্যবধান দীর্ঘমেয়াদে কয়েক বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত ব্যয়ে রূপ নিতে পারে।

এ ছাড়া দেশে বিদ্যুৎ খাতে উচ্চ চুক্তিমূল্যের কারণে সরকারকে প্রতিবছর প্রায় ৪.৯ বিলিয়ন ডলার ভর্তুকি দিতে হচ্ছে বলে জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির পর্যবেক্ষণ উল্লেখ করা হয়েছে। ভর্তুকি প্রত্যাহার করলে খুচরা বিদ্যুতের দাম ৮৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে—যা শিল্প ও ভোক্তা উভয়ের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলবে। ২০১১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদকদের বিল পরিশোধ ১১ গুণ এবং ক্যাপাসিটি চার্জ ২০ গুণ বৃদ্ধি পেলেও উৎপাদন বেড়েছে তুলনামূলকভাবে অনেক কম। পরিকল্পনা ঘাটতি ও জ্বালানি সরবরাহ সমস্যার কারণে কিছু কেন্দ্র প্রায় অচল অবস্থায় রয়েছে, যেগুলোকে অনেকে ‘ঘোস্ট প্ল্যান্ট’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

গবেষণার উপসংহারে বলা হয়েছে, অতিমূল্যায়িত চুক্তির পুনর্মূল্যায়ন, দুর্নীতির অভিযোগে লক্ষ্যভিত্তিক আইনি ব্যবস্থা, শক্তিশালী প্রয়োগব্যবস্থা এবং বাধ্যতামূলক প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়া ঋণের স্থিতিশীলতা রক্ষা সম্ভব নয়। ধীরে ধীরে আর্থিক সমন্বয়ের পরিবর্তে যদি অস্বচ্ছ ব্যয় অব্যাহত থাকে, তবে ব্যয়বহুল অবকাঠামোর দায় ভবিষ্যতে আকস্মিক ঋণসংকটে রূপ নিতে পারে।

অকা/প্র/ই/সকাল/১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 8 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version