অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে বেশ কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে, যা দেশের লেনদেনের ভারসাম্যে (ব্যালেন্স অব পেমেন্টস) উল্লেখযোগ্য উন্নতি এনেছে। দীর্ঘসময় সামষ্টিক অর্থনীতিতে অস্থিতিশীলতা থাকার পরও, অর্থপাচার কমে যাওয়া, রেমিট্যান্স প্রবাহে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি এবং আমদানির তুলনায় রফতানির উচ্চ প্রবৃদ্ধির মতো বেশ কিছু কারণ এই ইতিবাচক ধারার পেছনে কাজ করেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে দেশের লেনদেনের ভারসাম্যের সার্বিক ঘাটতি গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৯১ কোটি ডলার কমে এসেছে। আরও নির্দিষ্টভাবে বললে, গত অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত যেখানে এই ঘাটতি ছিল ৫৫৭ কোটি ডলার, চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬৫.৫ কোটি ডলারে, যা প্রায় ৮৮ শতাংশের বিশাল হ্রাস।
বাণিজ্য ঘাটতির ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। আমদানির চেয়ে দেশের রফতানির প্রবৃদ্ধি বেশি হওয়ায় গত অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিলের তুলনায় চলতি অর্থবছরের একই সময় শেষে আমদানি ও রফতানির পার্থক্য বা বাণিজ্য ঘাটতি কিছুটা কমেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল শেষে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮২৩ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরে ছিল ১ হাজার ৮৭০ কোটি ডলার। অর্থাৎ, এই ক্ষেত্রেও ঘাটতি প্রায় ২.৫১ শতাংশ কমেছে। এই সময়ে দেশের রফতানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮.৬ শতাংশ, যেখানে আমদানি বেড়েছে ৪.৬ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল শেষে দেশের চলতি হিসাবের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৩৯ কোটি ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৬০৩ কোটি ডলার। এটি ৭৭ শতাংশ বা ৪৬৪ কোটি ডলারের উল্লেখযোগ্য হ্রাস। উল্লেখ্য, আমদানি ও রফতানির পার্থক্য—বাণিজ্য ভারসাম্যের সঙ্গে প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি নেট ইনকাম যোগ করে চলতি হিসাবের ভারসাম্য বের করা হয়। এই ঘাটতি হ্রাসের পেছনে প্রধান সহায়ক ভূমিকা রেখেছে রেমিট্যান্সের উচ্চ প্রবৃদ্ধি। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ২ হাজার ৪৫৪ কোটি ডলার, যেখানে গত বছরের এই সময় শেষে রেমিট্যান্স এসেছিল ১ হাজার ৯১২ কোটি ডলার। অর্থাৎ, রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৮.৩ শতাংশ; গত অর্থবছরের তুলনায় ৫৪২ কোটি ডলার বেশি রেমিট্যান্স এসেছে, যা চলতি হিসাবের ভারসাম্যের ঘাটতি পূরণে সরাসরি অবদান রেখেছে।
তবে, লেনদেনের ভারসাম্যের অন্যতম উপাদান আর্থিক হিসাবের (ফাইন্যান্সিয়াল একাউন্ট) ক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। আলোচ্য সময়ে (জুলাই-এপ্রিল) আর্থিক হিসাবের উদ্বৃত্ত কমে ১৯৬ কোটি ডলার হয়েছে। মূলত, বিদেশি বিনিয়োগ ও বিভিন্ন দাতা সংস্থা থেকে সহায়তা আসা কমে যাওয়ায় আর্থিক হিসাবের ভারসাম্যে এই পরিবর্তন এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল শেষে দেশের আর্থিক হিসাবের উদ্বৃত্ত ছিল ২২৫ কোটি ডলার, অর্থাৎ চলতি অর্থবছরে উদ্বৃত্ত প্রায় ২৮ কোটি ৬০ লাখ ডলার কমেছে।
সার্বিকভাবে, যদিও আর্থিক হিসাবের উদ্বৃত্ত কিছুটা কমেছে, অর্থপাচার হ্রাস, রেমিট্যান্সের শক্তিশালী প্রবাহ এবং রফতানির উচ্চ প্রবৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের লেনদেনের ভারসাম্যে একটি সামগ্রিক ইতিবাচক ধারা বজায় রয়েছে, যা দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি ভালো লক্ষণ। ●
অকা/ব্যাংখা/ই/সকাল/৪ জুন, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 9 months আগে

