বিকাশ চন্দ্র বিশ্বাস
বর্তমানে দেশের বীমা বিশেষজ্ঞ ও বীমায় অভিজ্ঞ প্রশাসকের অভাব রয়েছে। মূলত আশির দশকের পর থেকে এই পেশায় কোন মেধাবীদের পদচারণা নেই বললেই চলে। নব্বয়ের দশকে দু’চারজন তথাকথিত ভাল ছাত্রের আগমন ঘটলেও নৈতিকতা ও বীমা সেক্টর এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের অবদান প্রশ্নবিদ্ধ। এদেশের বীমা সেক্টরে মেধাবীদের আগমন ঘটে ষাটের দশকে। এরপর সত্তর ও আশির দশকে কয়েকজন এসেছিলেন। তারপরে মাঠ শূন্য| এতোদিন জোড়াতালি দিয়ে চলার চেষ্টা হলেও হালে সেটিও আর সম্ভব হচ্ছে না। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ সংস্থার শীর্ষ শূন্যপদে যোগ্য ব্যক্তি খুঁজে পেতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের গলদঘর্ম হচ্ছে| বীমা সেক্টরের জন্য সৎ, অভিজ্ঞ ও ভাল প্রশাসক খুঁজতে সরকারের হয়তো কোন ত্রুটি নেই। ইতোমধ্যে কেউ কেউ হয়তো ব্যক্তিগত পর্যায়ে নিজেকে যোগ্য প্রার্থী হিসাবে উপস্থাপন করেছেন। অর্থ মন্ত্রণালয় এখনো পর্যন্ত কোন গ্রীণ সিগনাল দিয়েছেন বলে জানা নেই। হতে পারে সরকার অধিকতর যোগ্য প্রার্থী খুঁজছেন। যাই হোক, বীমার মতো গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরের শীর্ষপদ দীর্ঘদিন শূন্য রাখা অর্থনীতির জন্য শুভকর নয়। সেজন্য দেশের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে ও দীর্ঘ ২৯ বছর এই পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকার সুবাদে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য এ লেখা।
বীমা পেশার সঙ্গে দীর্ঘ চড়াই উৎরাই পেরিয়ে যে দু’জন শীর্ষ নির্বাহী শিক্ষা ও অভিজ্ঞতায় এই মুহূর্তে এগিয়ে, প্রথম জন হলেন প্রগতি লাইফের সিইও ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জালালুল আজিম এবং দ্বিতীয় জন হলেন বেঙ্গল ইসলামী লাইফের সিইও ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এম মনিরুল আলম (তপন)।
দেশের অন্যতম জীবন বীমা প্রতিষ্ঠান প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. জালালুল আজিম বিসিএস (রেলওয়ে) ক্যাডারসহ দীর্ঘ ৩৫ বছরের বহুমূখী পেশার অধিকারী মো. জালালুল আজিম তাঁর বর্ণিল কর্ম জীবনের ২৫ বছর কাটিয়েছেন বীমা প্রতিষ্ঠানে| প্রতিভাবান এই বীমা ব্যক্তিত্ব ২০১৩ সালে প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা এর দায়িত্ব পালন করেন। প্রগতি লাইফে যোগদানের পূর্বে তিনি ডেল্টা লাইফ ইনসিওরেন্স কোম্পানী লিমিটেড ও নন লাইফ বীমা প্রতিষ্ঠান প্রগতি ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড এ ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও হিসেবে কর্মরত ছিলেন| ১৯৯৬ সালে আমেরিকান লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানীতে (অ্যালিকো) যোগদানের মাধ্যমে বীমা কোম্পানিতে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। অ্যালিকোতে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত ছিলেন এবং ২০০২-২০০৬ সাল পর্যন্ত Agency Director পদে দায়িত্ব পালন করেন। অ্যালিকোতে তিনি তাঁর কর্ম দক্ষতার জন্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৯৬ সালে তিনি অ্যালিকো মিডেল ইস্ট, আফ্রিকা এবং সাউথ এশিয়া অঞ্চলের সেরা কর্মকর্তার সম্মানে ভূষিত হন। এছাড়া Agency Director এর দায়িত্ব পালনকালে ২০০২ ও ২০০৩ সালে টানা দুই বছর ALICO World এ সেরা Agency Director হিসেবে পুরস্কৃত হন। সৃজনশীলতা ও অভিজ্ঞতা তাঁকে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার পথ দেখিয়েছে। ২০০৬ সালে প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড এ যোগদানের পর কোম্পানিকে একটি আধুনিক ও প্রযুক্তি নির্ভর গুণগত মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলছেন। তাঁর বুদ্ধিদীপ্ত সিদ্ধান্ত ও দক্ষ নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটির সামগ্রিক সেবায় পরিবর্তনের ধারা সূচিত হয়েছে| সুদীর্ঘ ৯ বছরে তিনি প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্সকে গুণগত ব্যবসায়িক উন্নতি যুক্ত করেছেন। ২০২০-২১ সালে কোভিড-১৯ অতিমারীতে বিশ্বের অর্থনীতি যেখানে মুখ থুবড়ে পড়ে, সেখানে তাঁর দূরদর্শী সিদ্ধান্ত ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বে প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্সের উন্নয়নের পথ দেখিয়েছে। তিনি ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দে টাঙ্গাইল জেলার মধুপুরে জন্মগ্রহণ করেন| অত্যন্ত মেধাবী মো. জালালুল আজিম ঢাকা বিভাগ থেকে এসএসসি ও ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি প্রথম বিভাগে পাস করেন। ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃষি প্রকৌশল বিষয়ে ১ম শ্রেণীতে ১ম স্থান অধিকার করে স্নাতক (প্রকৌশল) ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ১৯৮৯-৯১ শিক্ষা বর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ (ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউট) থেকে এমবিএ ডিগ্রি লাভ করেন। আমেরিকার লাইফ ম্যানেজমেন্ট ইনষ্টিটিউট এর একজন ফেলো (FLMI) তিনি| তাছাড়া তিনি দেশের কাষ্টমার সার্ভিসেস ইনষ্টিটিউট থেকে Professional Customer Services (PCS) ডিপ্লোমা লাভ করেন| বীমা কোম্পানিতে যোগদানের আগে মো. জালালুল আজিম ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানীতে (বিটিসি) কর্মরত ছিলেন। এছাড়া তিনি একজন প্রাক্তন বিসিএস ক্যাডারভূক্ত কর্মকর্তা। ১০তম বিসিএস (রেলওয়ে) উত্তীর্ণ হয়ে তিনি বাংলাদেশ রেলওয়েতে কর্মরত ছিলেন।
এম এম মনিরুল আলম (তপন) ১৯৬৫ সালের ৫ অক্টোবর ঝিনাইদহ জেলার আরুয়াকান্দি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন| ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিসংখ্যান বিষয়ে প্রথম শ্রেণিতে স্নাতক (সম্মান) এবং একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে দ্বিতীয় শ্রেণি পেয়ে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করেন| নিজেকে যুক্ত করেন বীমা পেশায়| ১৯৯১ সালের ৭ মার্চ যোগ দেন ডেল্টা লাইফ ইনসিওরেন্স কোম্পানী লিমিটেড এ সিনিয়র এক্সিকিউটিভ পদে| কাজের শুরুতেই একচ্যুয়ারি সংক্রান্ত বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেন কোম্পানিটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাফাত আহমেদ চৌধুরীর কাছে| জীবন বীমার কলাকৌশল, আইটি, পুনঃবীমা এবং গোষ্ঠী বীমা নিয়ে কাজ করেন এ কোম্পানিতে| আরো কাজ করেন আরেক একচ্যুয়ারি ও বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এর প্রথম চেয়ারম্যান শেফাক আহমেদের তত্ত্বাবধানে ডেল্টা লাইফ ইনসিওরেন্স কোম্পানী লিমিটেড এবং প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড এ। তিনি ডেল্টা এবং প্রগতি লাইফের কর্মযোগে থাকাকালে দীর্ঘ সময়ের ধারাবাহিকতায় জীবন বীমা কার্যক্রমের ওপর বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেন। প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড এ অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদ অবধি দায়িত্ব পালন করেন| এ সময় তিনি একক ও ক্ষুদ্র বীমা ব্যবসার উন্নয়ন প্রশাসন, গোষ্ঠী জীবন বীমায় ব্যবসায় উন্নয়ন, পুনঃবীমার কারিগরি, দাবী ও সেবার দায়িত্ব পালন করেন| কর্ম অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ হয়ে এ এম এম মনিরুল আলম ২০১৫ সালের ১ জানুয়ারিতে দেশের চতুর্থ প্রজন্মের জীবন বীমা কোম্পানি গার্ডিয়ান লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড এ মুখ্য নির্বাহী হিসেবে যোগ দেন। যদিও প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড এ উপ ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) থাকাকালে ২ মাস চলতি দায়িত্বে (সিসি) মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা পদে কাজ করেন তিনি। ২০২০ পর্যন্ত সুদীর্ঘ ৬ বছর গার্ডিয়ান লাইফের সার্বিক উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধিতে গতি পায় তার সুচারু ব্যবস্থাপনায়। এ সময়ে তাঁর দক্ষতায় গার্ডিয়ান লাইফের ব্যবস্থাপনা ব্যয় হ্রাস পায়, অন্যদিকে গ্রাহককে সর্বোচ্চ পলিসি বোনাস প্রদানে কোম্পানি সক্ষম হয়। ২০২১ সালের পহেলা এপ্রিল তিনি এনআরবি গ্লোবাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড এর সিইও হিসাবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। ঘন ঘন সিইও বদল হওয়া কোম্পানিটিতে তিনিই অধিক সময়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। তাঁর যোগদানের কিছুদিনের মধ্যেই কোম্পানিটি নতুন নামে আত্মপ্রকাশ করে। বেঙ্গল ইসলামি লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড নামে চতুর্থ প্রজন্মের জীবন বীমা কোম্পানিটি তাঁর নেতৃত্বে স্বল্প সময়ে বেশ পরিচিতি লাভ করেছে। বীমা ব্যক্তিত্ব এম এম মনিরুল আলম বন্ধুবৎসল, যোগ্যতাসম্পন্ন, হাস্যোজ্জ্বল, প্রাণবন্ত, সুকুমার বৃত্তি এবং ইতিবাচক দৃষ্টির মানুষ। ব্যবসায়ে প্রবৃদ্ধি লাভে তাঁর স্বীকৃতি অনস্বীকার্য। তাঁর প্রচেষ্টায় ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ ও ২০২৫ সালে বেঙ্গল ইসলামি লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের প্রথম বর্ষ ও নবায়ন বীমা ব্যবসা বেড়েছে। তিনি গোষ্ঠী বীমার ব্যবসার সাফল্য অর্জনে একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র| কর্পোরেট ব্যবসাকে তিনি অধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।
তাঁদের দুজনই বীমা মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স এসোসিয়েশন (বিআইএ) এবং আইডিআরএ’র বিভিন্ন কমিটিতে উপদেশক হিসেবে যুক্ত। বীমা খাতে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি। দেশের কীর্তিমান বীমা বিশেষজ্ঞদের মধ্যে সকলেই এখন সত্তর ও আশি ঊর্ধ্ব বয়সি। ৬৭ বয়স সীমায় বর্তমানে যে ক’জন বীমা পেশায় যুক্ত আছেন, শিক্ষা-দীক্ষা, অভিজ্ঞতা, পেশাদারিত্ব ও প্রশাসনিক দক্ষতায় মোঃ জালালুল আজিম ও এম এম মনিরুল আলম (তপন) নিঃসন্দেহে সকলের চেয়ে এগিয়ে। ব্যক্তি পর্যায়ে যদি কোন অসাধুতার অভিযোগ না থাকে, তবে এই দু’জনার যেকোন একজন হতে পারেন বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এর চেয়ারম্যান পদের যোগ্য দাবিদার। অর্থ মন্ত্রণালয় এর আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ স্বপ্রণোদিত হয়ে কিংবা দেশের কীর্তিমান বীমা বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে সার্চ কমিটি গঠন করে এই নিয়োগের যর্থাথতা যাচাই করতে পারে। বীমা খাতের সত্যিকার উন্নয়নে যাচাই কমিটিতে ড. মোহাম্মদ সোহরাব উদ্দিন (একচ্যুয়ারি), এম শেফাক আহমেদ (একচ্যুয়ারি) এবং দাশ দেবপ্রসাদের মত যশস্বী ও কীর্তিমান বীমা বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করা সময়ের দাবি। তাঁদের মতামত বেশ গুরুত্ব বহন করে। ●
bikash.biswas751967
লেখক বীমা ও পরিসংখ্যান বিশ্লেষক
অকা/মপ্র/বীখা/নিলে/সৈইহো/বিকেল/২২ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 7 hours আগে

