অর্থকাগজ প্রতিবেদন 

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে নতুন ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ভোজ্য তেল ও চিনির মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্য নিয়ে ক্রেতাদের মধ্যে আতঙ্কজনিত কেনাকাটা বাড়তে শুরু করেছে। ফলে দেশে পর্যাপ্ত আমদানি ও মজুত থাকা সত্ত্বেও রাজধানীর অনেক খুচরা বাজারে এসব পণ্যের সাময়িক সংকট দেখা যাচ্ছে।

বর্তমানে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে ইসরায়েল–ইরান সংঘাত ঘিরে। এই পরিস্থিতির প্রভাব বিশ্ববাজারে পড়ার আশঙ্কায় অনেক ভোক্তা আগেভাগেই বেশি পরিমাণে খাদ্যপণ্য কিনে মজুত করছেন। ব্যবসায়ীদের মতে, এই আতঙ্ক থেকেই বাজারে তেল ও চিনির চাহিদা হঠাৎ করে বেড়ে গেছে।

ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকদের ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় সাময়িক অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও দেশের বাজারে এখনো তেল ও চিনির পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। তাদের দাবি, অন্তত এক মাসের চাহিদা মেটানোর মতো ভোজ্য তেল ও চিনি বর্তমানে দেশে সংরক্ষিত আছে এবং আমদানির কার্যক্রমও স্বাভাবিকভাবেই চলছে।

রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, খোলা সয়াবিন তেল প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১৭৮ থেকে ১৯৩ টাকার মধ্যে। পাঁচ লিটারের বোতলজাত তেলের দাম পড়ছে ৯৪০ থেকে ৯৫৫ টাকার মধ্যে, আর দুই লিটারের বোতল বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৩৯০ থেকে ৩৯৫ টাকায়। এছাড়া পাম তেল প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১৫৮ থেকে ১৬২ টাকায় এবং প্রতি কেজি চিনি পাওয়া যাচ্ছে ১০০ থেকে ১০৫ টাকার মধ্যে।

তবে খুচরা পর্যায়ে ভিন্ন চিত্রও দেখা যাচ্ছে। অনেক পাড়ার দোকানে চাহিদা অনুযায়ী সয়াবিন তেলের সরবরাহ নেই। বিশেষ করে পাঁচ লিটারের বোতল অনেক জায়গায় পাওয়া যাচ্ছে না। খুচরা বিক্রেতারা জানিয়েছেন, গত প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে এ ধরনের পরিস্থিতি চলছে।

ঢাকার শাহজাদপুর এলাকার এক দোকানি জানান, কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে আগের মতো সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। তার ভাষায়, “মানুষের চাহিদা হঠাৎ অনেক বেড়ে গেছে। কিন্তু কোম্পানিগুলো সেই অনুযায়ী তেল সরবরাহ করতে পারছে না।”

ক্রেতাদের মধ্যেও এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অনেকেই ভবিষ্যতে সংকট বা মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কায় আগাম পণ্য কিনে রাখছেন। ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকার এক বাসিন্দা জানান, যুদ্ধ শুরুর পর তিনি দুই মাসের বাজার একসঙ্গে করে রেখেছেন, যাতে ভবিষ্যতে সংকট তৈরি হলেও সমস্যায় পড়তে না হয়।

তবে পাইকারি বাজারের ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাস্তবে বড় ধরনের কোনো ঘাটতি নেই। রাজধানীর কারওয়ানবাজারের এক পাইকারি বিক্রেতার মতে, মাঝখানে দুই–একদিন সরবরাহে কিছু সমস্যা থাকলেও বর্তমানে তেল ও চিনির পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ২৫ লাখ টন সয়াবিন ও পাম তেলের চাহিদা রয়েছে। অন্যদিকে চিনির বার্ষিক চাহিদা প্রায় ২০ থেকে ২১ লাখ টন। এর মধ্যে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত চিনি খুবই সীমিত—প্রায় ৩০ থেকে ৩৭ হাজার টনের মতো। তাই দেশের অধিকাংশ চাহিদা পূরণ হয় আমদানির মাধ্যমে। বিশেষ করে রমজান মাসে এই দুই পণ্যের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।

আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তারাও বলছেন, প্রকৃত অর্থে দেশে তেল ও চিনির কোনো ঘাটতি নেই। তাদের মতে, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ভোক্তাদের মধ্যে অতিরিক্ত কেনাকাটার প্রবণতা তৈরি হওয়ায় খুচরা বাজারে সাময়িক চাপ তৈরি হয়েছে।

দেশের শীর্ষ ভোগ্যপণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ জানিয়েছে, তারা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে বেশি পরিমাণে তেল ও চিনি আমদানি করেছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমানে মাসে প্রায় ৫০ হাজার টনের বেশি তেল সরবরাহ করা হচ্ছে, ফলে বাজারে প্রকৃত সংকট হওয়ার কথা নয়।

একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছে সিটি গ্রুপ-ও। তাদের মতে, কিছু ছোট কোম্পানি এলসি খোলার জটিলতার কারণে আমদানি করতে না পারায় বাজারে সামান্য চাপ তৈরি হতে পারে। তবে সামগ্রিকভাবে বড় কোম্পানিগুলো নিয়মিত সরবরাহ বজায় রেখেছে।

অন্যদিকে ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বাজার পরিস্থিতির পেছনে শুধু আতঙ্কজনিত কেনাকাটাই দায়ী নয়। অনেক ক্ষেত্রে কিছু ডিলার বা খুচরা ব্যবসায়ী সংকটের সুযোগ নিয়ে পণ্য মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে পারেন। এ কারণে বাজারে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-এর নেতাদের মতে, দেশে পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং পাইপলাইনে থাকা কাঁচামালসহ মোট মজুত কয়েক মাসের চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম। তাই বাজারে যদি সংকট দেখা যায়, তাহলে তা অনেক ক্ষেত্রে কৃত্রিমভাবে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

সব মিলিয়ে ব্যবসায়ী, আমদানিকারক এবং বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি মূলত আতঙ্ক ও গুজবের প্রভাবে তৈরি হয়েছে। বাস্তবে দেশে তেল ও চিনির সরবরাহ এখনও স্বাভাবিক রয়েছে। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারকে বাজার তদারকি আরও জোরদার করতে হবে, যাতে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি বা কৃত্রিম সংকট তৈরি না হয়।

অকা/প্র/ই/সকাল/১২ মার্চ, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 2 months আগে

Leave A Reply

Exit mobile version