অর্থকাগজ প্রতিবেদন

বাংলাদেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) আবারও মূল্যবৃদ্ধির মুখে পড়েছে, এবং তা এক মাসের ব্যবধানে দুই দফায়। জ্বালানি তেলের সামগ্রিক মূল্যবৃদ্ধির দিনেই দ্বিতীয় দফায় এলপিজির দাম বাড়ানো হয়, যা বাজারে নতুন করে চাপ তৈরি করেছে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতি কেজি এলপিজির দাম বাড়ানো হয়েছে ১৭ টাকা ৬২ পয়সা। ১৯ এপ্রিল সন্ধ্যা থেকে কার্যকর হওয়া এই নতুন দামে ১২ কেজির বহুল ব্যবহৃত সিলিন্ডারের মূল্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,৯৪০ টাকা—যা আগে ছিল ১,৭২৮ টাকা। অর্থাৎ, মাত্র এক মাসেই একটি সিলিন্ডারে ২১২ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।

এর আগেও এপ্রিলের শুরুতে প্রতি কেজিতে ৩২ টাকা ৩০ পয়সা বাড়ানো হয়েছিল। ফলে চলতি বছরে এখন পর্যন্ত পাঁচ দফায় এলপিজির মূল্য সমন্বয় করা হলো। তবে বাস্তবতা হলো, নির্ধারিত মূল্যের চেয়েও বেশি দামে বাজারে এলপিজি বিক্রির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। মাঠপর্যায়ে দেখা যাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে সরকারি দামের চেয়ে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে।

ভোক্তার চাপ ও বিকল্পে ফেরার প্রবণতা

দফায় দফায় মূল্যবৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয় কাঠামোতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও যেখানে এলপিজি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল, এখন অনেক পরিবার আবার মাটির চুলার মতো বিকল্পে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবছে।

গৃহস্থালি ছাড়াও ছোট গার্মেন্টস, রেস্টুরেন্ট এবং ভাসমান খাবারের দোকানগুলোতে এলপিজির ব্যবহার ব্যাপক। ফলে জ্বালানি খরচ বাড়ায় এসব খাতে পণ্যের দাম বাড়ানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এমনকি পরিবহন খাতেও এলপিজির ব্যবহার বাড়তে থাকায় এর প্রভাব বহুমাত্রিক হয়ে উঠছে।

অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক প্রতিক্রিয়া

ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলমের মতে, এলপিজি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে এর ব্যবহার সর্বত্র ছড়িয়ে গেছে। তাই হঠাৎ মূল্যবৃদ্ধি শুধু ভোক্তা পর্যায়েই নয়, সামগ্রিক অর্থনীতিতেও চাপ তৈরি করে।

তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জ্বালানির দাম বাড়লে ভোক্তারা ব্যয় কমাতে বাধ্য হন। এতে পণ্যের চাহিদা কমে যায়, ব্যবসায়িক কার্যক্রম শ্লথ হয়, এবং সরকার ভ্যাট-ট্যাক্স আদায়ে পিছিয়ে পড়ে। পরবর্তীতে ঘাটতি পূরণে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ে, যা বেসরকারি বিনিয়োগকে সংকুচিত করে। পরিস্থিতি আরও জটিল হলে মুদ্রাস্ফীতি বাড়ে, ক্রয়ক্ষমতা কমে এবং অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি হয়।

মূল্যবৃদ্ধির পেছনের যুক্তি ও বিতর্ক

বিইআরসি বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের বিঘ্নের কারণে আমদানি ব্যয় বেড়েছে। বিকল্প পথে জ্বালানি আনতে সময় ও খরচ দুটোই বেড়েছে, সঙ্গে যোগ হয়েছে বিমা ও নিরাপত্তা ব্যয়। প্রতি মেট্রিক টনে অতিরিক্ত প্রায় ২৫০ ডলার খরচ বিবেচনায় নিয়ে দাম সমন্বয় করা হয়েছে।

তবে এই যুক্তিকে একপাক্ষিক বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের প্রশ্ন—যে পণ্য এখনো দেশে পৌঁছায়নি, তার আগাম মূল্য নির্ধারণ কতটা যৌক্তিক? এছাড়া, মাসে একবার দাম নির্ধারণের নীতির বাইরে গিয়ে একই মাসে দুইবার সমন্বয় করাও প্রশ্নবিদ্ধ বলে মনে করছেন তারা।

বাজার কাঠামো ও বাস্তবতা

২০২১ সালের এপ্রিল থেকে বিইআরসি এলপিজির দাম নির্ধারণ করছে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে। তবে গণশুনানির মাধ্যমে নয়, বরং আমদানি মূল্য, পরিবহন খরচ, ডলার রেটসহ বিভিন্ন উপাদান বিবেচনায় দাম ঠিক করা হয়।

বাংলাদেশে এলপিজির বড় অংশই আমদানিনির্ভর—বিশেষ করে সৌদি আরব ও কাতার থেকে। বর্তমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতায় সরবরাহ চেইন ব্যাহত হওয়ায় সামনে আরও চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সামনে কী অপেক্ষা করছে

বিইআরসি ইতোমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছে, পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে এলপিজির দাম আরও বাড়তে পারে। আগামী মূল্য সমন্বয় নির্ধারিত রয়েছে মে মাসের শুরুতে।

সব মিলিয়ে, এলপিজির এই ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধি শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ নয়—এটি ধীরে ধীরে ভোক্তা ব্যয়, ব্যবসা, রাজস্ব এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। এখন বড় প্রশ্ন—এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা কোথায় গিয়ে থামবে, এবং তা সামাল দিতে নীতিনির্ধারকদের কাছে কী কৌশল রয়েছে।

সর্বশেষ হালনাগাদ 10 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version