অর্থকাগজ প্রতিবেদন
বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে দীর্ঘমেয়াদি চাপ ও অনিশ্চয়তার এক জটিল পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির মতে, ধারাবাহিকভাবে কমে আসা প্রবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা মিলিয়ে সামষ্টিক অর্থনীতিতে গভীর চাপ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকারকে কঠোর কাঠামোগত সংস্কার ও কিছু অজনপ্রিয় হলেও প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অন্যথায় অর্থনীতিকে স্থিতিশীল পথে ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়বে।
সোমবার ১৮ মে বিশ্বব্যাংক ও Policy Research Institute আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট : স্পেশাল ফোকাস’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং ভবিষ্যৎ ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আর্থিক খাতের দুর্বলতা, বেসরকারি বিনিয়োগের নিম্নমুখিতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবে চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে আসতে পারে। এতে টানা তৃতীয় বছরের মতো অর্থনৈতিক মন্থরতা অব্যাহত থাকার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কয়েক দশক ধরে ৭ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধির যে ধারা ছিল, বর্তমান পরিস্থিতি তা থেকে বড় ধরনের বিচ্যুতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনীতির চারটি বড় সংকট—মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং বৈদেশিক চাপ—মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে আরও তীব্র হয়েছে। বিশেষ করে বেসরকারি বিনিয়োগ গত ৩৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যাওয়া অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে উদ্বেগজনক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে শিল্প ও কৃষি—দুই প্রধান উৎপাদন খাতেই প্রবৃদ্ধি কমে আসায় সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়তে থাকায় অর্থনীতিকে রক্ষা করার মতো নীতিগত সক্ষমতা ক্রমেই সীমিত হয়ে পড়ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে, ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ছে। ২০১৮ সালে যেখানে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ, সেখানে ২০২৫ সালে তা বেড়ে ২১ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছানোর আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ সময়ে অতিরিক্ত প্রায় ১৪ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারে।
বিশ্বব্যাংক আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা দীর্ঘায়িত হলে রেমিট্যান্স প্রবাহে ধাক্কা লাগতে পারে। একই সঙ্গে আমদানি ব্যয় বাড়বে এবং মূল্যস্ফীতির চাপ পরিবারের ব্যয়ক্ষমতাকে আরও সংকুচিত করবে। ফলে দারিদ্র্য কমানোর প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণ করা হলেও মূল্যস্ফীতির হার প্রত্যাশিতভাবে কমছে না বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সেমিনারে অংশ নেওয়া অর্থনীতিবিদরা মূল্যস্ফীতির পেছনে সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, বাজারে অস্বচ্ছতা এবং দুর্নীতিকে বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। তাদের মতে, কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতে নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষের মজুরি বাস্তব অর্থে কমে যাওয়ায় তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
তারা সতর্ক করে বলেন, এই পরিস্থিতিতে অতিদ্রুত মুদ্রানীতি শিথিল করলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে। তাই দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহ ব্যবস্থার সংস্কার এবং কাঠামোগত পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
অন্যদিকে ব্যাংকিং খাতও গভীর চাপের মুখে রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঋণ শ্রেণিবিন্যাসে কঠোরতা আরোপ এবং কয়েকটি ব্যাংক পুনর্গঠনের উদ্যোগের ফলে খেলাপি ঋণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এতে ব্যাংকগুলোর সম্পদের গুণগত মান দুর্বল হয়েছে এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংক খাতকে স্থিতিশীল করতে দ্রুত মূলধন জোগান বৃদ্ধি, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, তদারকি জোরদার এবং সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে রাজস্ব আয় কমে যাওয়ায় সরকারের সামাজিক খাতে ব্যয়ও কমে এসেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে মানবসম্পদ উন্নয়ন ও দারিদ্র্য মোকাবিলায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
সর্বশেষ হালনাগাদ 5 hours আগে

