অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
বাংলাদেশ ব্যাংক সাধারণ মানুষের জন্য সরাসরি দেওয়া পাঁচটি রিটেইল সেবা বন্ধ করার সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে, যা মূলত নিরাপত্তা ঝুঁকি কমানো, ভবন আধুনিকায়ন এবং সংবেদনশীল কার্যক্রমকে আন্তর্জাতিক মানে পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক সভা, ক্যাশ বিভাগ পরিদর্শন এবং একটি বিশেষ কমিটির পর্যবেক্ষণ শেষে সিদ্ধান্তটি চূড়ান্ত করা হয়। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৩০ নভেম্বর থেকে মতিঝিল সদর দপ্তরসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্যান্য অফিসে আর এসব রিটেইল সেবা পাওয়া যাবে না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান নিশ্চিত করেছেন যে সিদ্ধান্তটি অর্থ মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে এবং খুব শিগগিরই জনসাধারণকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হবে। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারের পক্ষে ১০ ধরনের রিটেইল সেবা পরিচালনা করে, যার মধ্যে পাঁচটি—সঞ্চয়পত্র আদান–প্রদান, প্রাইজবন্ড বিক্রি, ত্রুটিযুক্ত নোট বিনিময়, পিএডি লেনদেন এবং চালানের ভাংতি—বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। এসব সেবা পরিচালনায় ব্যবহৃত ১২টি কাউন্টারও কার্যক্রম থেকে সরিয়ে নেওয়া হবে। তবে সরকারি প্রয়োজনে সঞ্চয়পত্র, প্রাইজবন্ড ও চালানসংক্রান্ত লেনদেনের জন্য একটি অভ্যন্তরীণ কাউন্টার রেখে দেওয়া হবে, যাতে অফিসিয়াল প্রয়োজন পূরণ করা যায়।
গত জুনে গভর্নর মূল ভবনের ক্যাশ বিভাগ পরিদর্শনের সময় বেশ কিছু দুর্বলতা চিহ্নিত করেন। এরপর গঠিত কমিটি সেপ্টেম্বর মাসে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়, যেখানে দেখা যায়—বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল ভবন কেপিআই নিরাপত্তা আওতায় থাকা সত্ত্বেও একাধিক ঝুঁকি বিদ্যমান। একই ভবনে মুদ্রা ইস্যু ও বিতরণ, ভল্ট ব্যবস্থাপনা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তদারকি এবং ব্যাংকিং খাত পর্যবেক্ষণ—এই চারটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ পরিচালিত হয়। সাধারণ মানুষের অতিরিক্ত ভিড় এসব সংবেদনশীল কার্যক্রমের নিরাপত্তাকে বাধাগ্রস্ত করে এবং ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। প্রতিবেদনটি অতীতের রিজার্ভ হ্যাকিং, সঞ্চয়পত্র জালিয়াতি, ভবনের ভেতরে ছবি–ভিডিও ধারণ, নিরাপত্তা কর্মীদের সঙ্গে বিরোধের মতো ঘটনার কথাও উল্লেখ করে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়—সঞ্চয়পত্র বা প্রাইজবন্ড বিক্রি ও সংশ্লিষ্ট সেবা বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে সহজেই দেওয়া সম্ভব এবং দেশের ৬০টির বেশি ব্যাংক ইতোমধ্যে এসব সেবা প্রদানের সক্ষমতা অর্জন করেছে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরাসরি কাউন্টার সেবা বন্ধ করলেও জনগণকে সেবাবঞ্চনার ঝুঁকি নেই। উন্নত বিশ্বের কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাধারণ মানুষের কাছে সরাসরি রিটেইল সেবা দেয় না; বাংলাদেশ ব্যাংকের এই পরিবর্তন সেই বৈশ্বিক ধারা অনুসরণ করছে।
যারা পূর্বে সঞ্চয়পত্র কিনেছেন, তাদের জন্য প্রয়োজনীয় সব সেবা পূর্বের মতোই চালু থাকবে। সঞ্চয়পত্রের মেয়াদপূর্তির আগ পর্যন্ত নিয়মিত সেবা—নমিনি সংযোজন বা পরিবর্তন, ব্যাংক হিসাব পরিবর্তন, মোবাইল নম্বর হালনাগাদ, মৃত্যু পরবর্তী নিষ্পত্তি, আগাম নগদায়ন—সবই আগের নিয়মে পরিচালিত হবে। তবে মেয়াদপূর্তির পর সঞ্চয়পত্র পুনঃবিনিয়োগ করা যাবে না; এটি নীতিগতভাবে একটি বড় পরিবর্তন।
সব মিলিয়ে সিদ্ধান্তটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাঠামোগত সংস্কারের অংশ, যেখানে রিটেইল কার্যক্রম থেকে বেরিয়ে এসে নিরাপত্তা, রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা, নীতি নির্ধারণ এবং তদারকির মতো মূল কার্যক্রমে বেশি মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে। ভবনের ভিড় কমানো, ভল্ট ব্যবস্থাপনার নিরাপত্তা জোরদার করা এবং আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অপারেশন পুনর্গঠন এই সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য। ●
অকা/ব্যাংখা/ই/সকাল/১৮ নভেম্বর, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 2 weeks আগে

