অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
বিশ্ব বাজারের সঙ্গে মিলিয়ে দেশেও সোনার দাম সমন্বয় করেছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস)।
সবশেষ ৮ নভেম্বর সমন্বয়ের পর ভালো মানের অর্থাৎ ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার দাম হয়েছে এক লাখ ৩৮ হাজার ৭০৮ টাকা। এছাড়া ২১ ক্যারেটের এক ভরি সোনার দাম এক লাখ ৩২ হাজার ৩৯৮ টাকা।
১৮ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম এক লাখ ১৩ হাজার ৪৯১ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আর সনাতন পদ্ধতির এক ভরি স্বর্ণের দাম ৯৩ হাজার ১৬০ টাকা করা হয়েছে।
সোনার পাশাপাশি রুপার দামও বাড়নো হয়েছে। বাড়তে বাড়তে রুপার দাম গিয়ে ঠেকেছে প্রতি ভরি রুপার দাম দুই হাজার ৬২৪ টাকা।
দাম বাড়ায় সোনার দোকানগুলোতেও ক্রেতা কমতির দিকে।
তাঁতিবাজারের পাপড়ি জুয়েলার্সের বিক্রেতা মো. সোহেল রানা বলেন, “কাস্টমার খুবই কম। বিক্রিও পড়ে গেছে। আগে কাস্টমার ৩-৪ ভরি স্বর্ণ কিনত, এখন এক ভরি কিনতেই হিমশিম খাচ্ছে।” ৬ মাস ধরেই এমন মন্দা অবস্থা বলে জানান তিনি। এমন পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের আসল মুনাফা ‘হিডেন চার্জের’ মাধ্যমে।
স্বর্ণালঙ্কার বিক্রিতে দোকানিরা দামের সঙ্গে ৫/৬ শতাংশ তৈরির খরচও যোগ করেন। এর সঙ্গে যোগ হয় ভ্যাট।
“এমনিতেই দাম বেশি। এর মধ্যে আবার ৫ শতাংশ এক্সট্রা ভ্যাট। ৬ শতাংশ নেয় মেকিং চার্জ।
দাম বাড়ায় সীমিত আয়ের মানুষ কখনও স্বর্ণলঙ্কার বন্ধক রেখে উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন। কিন্তু বন্ধকী প্রতিষ্ঠানে গিয়ে তারা পাচ্ছেন না কাক্সিক্ষত দাম। উল্টো শুনতে হচ্ছে, ‘দাম বাড়েনি, বরং পড়তির দিকে’।
ফরিদপুরের গৃহিণী সুলতানা খানম বলেন, “সোনার দাম বেড়েছে শুনে স্বামীর দেওয়া গহণা বন্ধক রাখতে গেলাম। এখন স্বর্ণকার বলছেন দাম বাড়ে নাই। দাম ধরছে কেবল স্বর্ণের মান অনুযায়ী ৮০ হাজার থেকে ৯০ হাজার টাকা (ভরিতে)।”
একই সুর মিলল বুশরা তাসনিমের কণ্ঠেও। বলেন, “গ্রামে থাকি, আমরা তো এতকিছু বুঝি না। কখন দাম বাড়ে আর কমে তাও জানি না। সেদিন উপজেলায় গেলাম, বলে বন্ধক রাখলে দাম পড়বে ৮০ হাজার থেকে ৯০ হাজার টাকা।”
বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাজুস) এর তথ্য মতে, বছরে ১৮ থেকে ২০ টন নতুন সোনার চাহিদা আছে বাংলাদেশে। অবশ্য স্বর্ণ নীতিমালা (২০১৮) অনুযায়ী, দেশে বছরে সোনার চাহিদা আরও বেশি। নীতিমালা অনুযায়ী এর পরিমাণ ১৮ থেকে ৩৬ টন।
আমদানির তথ্যে দেখা যায়, ২০২২ সালেই বৈধভাবে দেশে সোনা এসেছে অন্তত ৫৪ টন। তবে বৈশ্বিক বাজার অস্থিতিশীলতার ছাপ পড়েছে সোনা আমদানিতেও।
উচ্চমূল্য আর ডলারের বিনিময় হারের দাপট ও সঙ্গে বাংলাদেশের রিজার্ভে টান পড়তে থাকলে আমদানি কমে যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২১-২২ অর্থ বছরে যেখানে ৪১ লাখ ৬৪ হাজার ডলারের সোনা আমদানি করা হয়েছিল, সেখানে ২০২২-২৩ অর্থ বছরে আসে ৬ লাখ ৭০ হাজার ডলারের সোনা। এক বছরের মাথায় আমদানি কমেছে প্রায় ৮৪ শতাংশ।
এসব মূলত প্রাতিষ্ঠানিক আমদানির তথ্য। ব্যবসায়ীরা বলেছেন, প্রাতিষ্ঠানিক আমদানি কম হওয়ার কারণ এতে উচ্চ শুল্ক-কর।
যাত্রী (অপর্যটক) ব্যাগেজ বিধিমালা অনুযায়ী, বিদেশ থেকে আসার সময় একজন যাত্রী যে পরিমাণ সোনা আনতে পারেন তার শুল্ক যেমন কম; তেমনি বিনা শুল্কে আনা সোনার তথ্য নথিভুক্তও করে না কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।
প্রাতিষ্ঠানিক আমদানি কমার তথ্য মেলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের-এনবিআর পরিসংখ্যানেও।
এনবিআরের তথ্য বলছে, বাংলাদেশ ব্যাংক ১৯টি প্রতিষ্ঠানকে সোনা আমদানির ডিলার হিসেবে লাইসেন্স দিলেও লাইসেন্স পাওয়ার পর ২০২০ থেকে ২০২৩ এর জুন পর্যন্ত প্রায় ৮২ লাখ ডলার ব্যয় করে সাতটি প্রতিষ্ঠান ১৩৯ কেজি ৬৪০ গ্রাম ওজনের সোনার বার আমদানি করেছে। ১২টি প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স পেয়েও আমদানি করেনি।
বাংলাদেশ মূলত যে গঠনের সোনা আমদানি করে তাতে ৫ শতাংশ শুল্ক রয়েছে। ভারতেও এতে কোনো শুল্ক নেই।
এটি যেহেতু মানের (ভ্যালু) ওপর দিতে হয়, বৈশ্বিক বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় শুল্কও তাই বেড়েছে। এক লাখ টাকায় এক ভরি আমদানি করলে তার শুল্ক পড়ছে ৫ হাজার টাকা; যেখানে ব্যাগেজ বিধির অধীনে দিতে হচ্ছে ৪ হাজার টাকা।
৫ শতাংশ শুল্ক ধরে ৪ হাজার টাকার মধ্যে শুল্ক-কর রাখতে হলে আমদানি পর্যায়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সোনার দাম হতে হবে ৮০ হাজার টাকা ভরি। এর ওপর হলেই ব্যাগেজের আওতায় দাম কম পড়বে যেহেতু এতে শতাংশ নয় বরং নির্দিষ্ট শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে।
এর বাইরে আরও কিছু গঠনের সোনা আনার সুযোগ থাকলেও শুল্ক অনেক বেশি হওয়ায় সেসব ব্যবসায়ীরা আনেন না। যেমন, কয়েন। বৈধ দরপত্রে ব্যবহৃত নয়, এমন (গোল্ড কয়েন ব্যতিত) কয়েন আমদানিতে বাংলাদেশে সাকুল্যে শুল্ক রয়েছে ৫৮ দশমিক ৬০ শতাংশ, ভারতেও যা কেজিতে ১০ শতাংশ।
বাংলাদেশের বৈধ দরপত্রে ব্যবহৃত এমন কয়েন আমদানিতে সাকুল্যে শুল্ক ৩১ শতাংশ, ভারতে যা রয়েছে কেজিতে ১০ শতাংশ। ●
অকা/শিবা/ফর/দুপুর/১০ নভেম্বর, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 1 year আগে

