অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে সংসদ সদস্যদের ব্যক্তিগত ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিপুল অঙ্কের খেলাপি ঋণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই তথ্য তুলে ধরে দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩১ কোটি টাকা। এছাড়া বর্তমান সংসদ সদস্যদের কেউ কেউ এবং তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১১ হাজার ১১৭ কোটি টাকা। উল্লেখযোগ্যভাবে, আদালতের নির্দেশনার কারণে আরও প্রায় ৩ হাজার ৩৩০ কোটি টাকার ঋণ খেলাপি হিসেবে গণনা করা হয়নি।
অর্থমন্ত্রী সংসদে জানান, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময় থেকেই একাধিক অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। বৈশ্বিক অস্থিরতা, পণ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বৈদেশিক লেনদেনে চাপ, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং অতীতের বিভিন্ন অনিয়ম—সব মিলিয়ে অর্থনীতির ভিত্তি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। তবে এসব প্রতিকূলতার মধ্যেও অর্থনীতিকে স্থিতিশীল ও শক্তিশালী করতে সরকার নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।
সংসদে শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের তালিকাও প্রকাশ করা হয়। এতে দেখা যায়, বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষভাবে আলোচনায় আসে এস আলম গ্রুপ-এর একাধিক প্রতিষ্ঠান, যেগুলো তালিকার শীর্ষস্থানে রয়েছে। এছাড়া বেক্সিমকো গ্রুপ-এর কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। যদিও এসব প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট ঋণের পরিমাণ প্রকাশ করা হয়নি, তবুও তাদের অবস্থান ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকির মাত্রা স্পষ্ট করে।
খেলাপি ঋণের পাশাপাশি জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি ও এলএনজি আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়ায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বাজেট সহায়তা গ্রহণসহ ব্যয় সাশ্রয়ের বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী আরও জানান, অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে সরকার বিভিন্ন খাতে সংস্কার কার্যক্রম চালাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে—ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, ঋণ আদায় জোরদার করা, আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং করব্যবস্থার আধুনিকায়ন। একই সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ করে নিম্নআয়ের মানুষের সহায়তায় ভাতা কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে।
অর্থনীতির একটি ইতিবাচক দিক হলো মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, যা বর্তমানে প্রায় ২,৭৬৯ মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। সরকারের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করা। এই লক্ষ্যে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্পায়ন, তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উন্নয়ন এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহায়তায় নানা কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
এছাড়া কৃষিখাতেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য ঋণ মওকুফ ও স্বল্পসুদে ঋণ প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার আওতায় প্রায় ১৩ লাখের বেশি কৃষক উপকৃত হবেন। অন্যদিকে, ডিজিটাল লেনদেনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ও ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ে প্রতারণা রোধে একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, দেশের অর্থনীতি বর্তমানে একদিকে যেমন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে, অন্যদিকে তেমনি সম্ভাবনার দিকেও এগিয়ে যাচ্ছে। তবে খেলাপি ঋণের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। ●
অকা/ব্যাংখা/ই/দুপুর/৭ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 9 hours আগে

