বিশেষ প্রতিনিধি>

একটি রাষ্ট্র যখন বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়, তখন শুধু ক্ষমতার পালাবদলই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন হয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠন এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য একটি গ্রহণযোগ্য কাঠামো তৈরি করা। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতাও সেই প্রয়োজনের সামনে দাঁড়িয়েছে। জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, নির্বাচনব্যবস্থা, সাংবিধানিক কাঠামো এবং ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে যে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে, তার কেন্দ্রে উঠে এসেছে জুলাই সনদ।

এই সনদকে ঘিরে প্রত্যাশা যেমন তৈরি হয়েছে, তেমনি দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন ও বিতর্কও। এর কারণ শুধু সনদের বিষয়বস্তু নয়; বরং এর রাজনৈতিক ব্যাখ্যা, বাস্তবায়ন পদ্ধতি এবং জাতীয় ঐকমত্যের পরিধি নিয়েও ভিন্নমত রয়েছে। ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—জুলাই সনদ কি সত্যিই দেশের রাজনৈতিক বিভাজন কমিয়ে বৃহত্তর ঐকমত্যের ভিত্তি তৈরি করবে, নাকি এর রাজনৈতিক ব্যবহারই নতুন করে বিভাজনকে তীব্র করবে?

জুলাই সনদকে কখনোই কেবল আরেকটি রাজনৈতিক ইশতেহার হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি। বরং জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের প্রাতিষ্ঠানিক উত্তরাধিকার হিসেবে এর গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুনভাবে সাজানো এবং শাসনব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কারের একটি কাঠামো হিসেবেই সনদটি প্রণীত হয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে দেশে যে সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের দাবি উঠে আসছে, সেগুলোকে বাস্তব রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে জুলাই সনদ একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হতে পারে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিত করা, নির্বাচন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ানো এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর ভারসাম্য ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার মতো বিষয়গুলো নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। এসব দাবি বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত হয়ে আসছে।

তবে একটি ইতিবাচক উদ্যোগও রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপ ও সমঝোতা তৈরিতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু সংলাপ অনুষ্ঠিত হওয়া এবং সর্বসম্মত ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হওয়া এক বিষয় নয়। কমিশন ৩৩টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে আলোচনা করেছে—দেশের নিবন্ধিত সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নয়।

এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সনদের মধ্যেই বিভিন্ন মৌলিক প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর মতপার্থক্যের বিষয়টি স্বীকার করা হয়েছে। ফলে সনদটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হতে পারে, কিন্তু এটিকে সর্বস্তরে সর্বসম্মত জাতীয় চুক্তি হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। এই পার্থক্যটি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

কিন্তু বাস্তব রাজনৈতিক প্রচারে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) অনেক সময় জুলাই সনদকে এমনভাবে উপস্থাপন করছে, যেন এটি ইতোমধ্যেই একটি প্রশ্নাতীত জাতীয় ম্যান্ডেটের মর্যাদা লাভ করেছে। তাদের বক্তব্যে এমন একটি ধারণা তৈরি হচ্ছে যে, গণভোটে জনসমর্থন পাওয়া বা সনদের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার মধ্য দিয়েই সাংবিধানিকভাবে বিতর্কিত বিষয়গুলোর চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়ে যাবে এবং ভবিষ্যৎ সরকারগুলোও নির্দিষ্ট একটি বাস্তবায়ন কাঠামোর বাইরে যেতে পারবে না।

এ ধরনের ব্যাখ্যা বাস্তবতার তুলনায় অতিরিক্ত সরল এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য উদ্বেগজনক। গণভোট কোনো সংস্কার উদ্যোগকে রাজনৈতিক বৈধতা দিতে পারে, কিন্তু সেটি সংবিধান সংশোধনের নির্ধারিত প্রক্রিয়া, সংসদীয় পর্যালোচনা কিংবা বৃহত্তর গণতান্ত্রিক আলোচনার বিকল্প হতে পারে না। একইভাবে গণভোটের ফলাফল দেখিয়ে সনদের ভেতরে থাকা মতপার্থক্যগুলোকেও অদৃশ্য করে দেওয়া সম্ভব নয়।

আরও উদ্বেগের বিষয়, সনদের বাস্তবায়ন পদ্ধতি কিংবা এর কোনো নির্দিষ্ট প্রস্তাব নিয়ে প্রশ্ন তুললেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা বা সংস্কারবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এ ধরনের রাজনৈতিক প্রবণতা গণতান্ত্রিক বিতর্কের পরিসরকে সংকুচিত করতে পারে। কোনো ব্যক্তি বা দল প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নিলেই যে সনদের প্রতিটি প্রস্তাব কিংবা প্রতিটি বাস্তবায়ন পদ্ধতিকে নিঃশর্তভাবে সমর্থন করতে হবে—গণতন্ত্রের যুক্তি এমন নয়।

বরং একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা যুক্তিনির্ভর মতপার্থক্য, উন্মুক্ত আলোচনা এবং ভিন্নমতকে গ্রহণ করার সক্ষমতার ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়। সংস্কারের বিষয়ে ভিন্নমত থাকা মানেই সংস্কারবিরোধিতা নয়। বরং প্রস্তাবগুলোর ভালো-মন্দ নিয়ে আলোচনা এবং বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তোলাই একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক অংশ।

জুলাই সনদের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে এর অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র। জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি হিসেবে এটি কার্যকর হতে হলে ভিন্নমতকে দমন বা অস্বীকার না করে তা স্বীকার করতে হবে। যে দলিল রাজনৈতিক বিভাজন বাড়ানোর পরিবর্তে ঐকমত্যের সংস্কৃতি তৈরি করতে সক্ষম হয়, দীর্ঘমেয়াদে ইতিহাসে তার স্থানই বেশি স্থায়ী হয়। কিন্তু বর্তমানে যে বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে, তাতে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রণীত একটি দলিলই ধীরে ধীরে রাজনৈতিক বিরোধ ও সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করছে।

এই জায়গাতেই জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। জুলাই সনদকে আরও বিস্তৃত রাজনৈতিক সমঝোতা ও জাতীয় সংলাপের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহারের পরিবর্তে যদি এটিকে দলীয় রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তাহলে এর মূল উদ্দেশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রতিটি সাংবিধানিক বিতর্ককে জুলাই আন্দোলনের প্রতি আনুগত্যের পরীক্ষায় পরিণত করা কোনোভাবেই দীর্ঘস্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের পথ সুগম করবে না। বরং এতে সাময়িক রাজনৈতিক সুবিধা অর্জিত হলেও ভবিষ্যতে আরও বিভাজন তৈরি হতে পারে।

তবে এই দায় কেবল রাজনৈতিক দলগুলোর নয়। সরকারেরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন, যাতে জুলাই সনদকে এমনভাবে উপস্থাপন করা না হয়, যেন এটি দেশের সব রাজনৈতিক শক্তি ও জনগণের প্রশ্নাতীত ঐকমত্যের প্রতিফলন। বাস্তবতা হলো, সনদ প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় বিস্তৃত আলোচনা হয়েছে, বেশ কিছু বিষয়ে সমঝোতাও তৈরি হয়েছে; পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে মতভেদও রয়ে গেছে। সেই মতপার্থক্য স্বীকার করা কোনো দুর্বলতার লক্ষণ নয়। বরং মতভেদকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং তার মধ্য দিয়েই সমাধানের পথ খোঁজা গণতান্ত্রিক রাজনীতির অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট্য।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে যারা রাজপথে নেমেছিলেন, তাদের আকাঙ্ক্ষার অন্যতম দিক ছিল জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, অবাধ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন এবং ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করা একটি কার্যকর সাংবিধানিক ব্যবস্থা। তারা নতুন করে রাজনৈতিক অচলাবস্থা, বিভাজন কিংবা ক্ষমতা দখলের কৌশলগত প্রতিযোগিতা দেখতে চাননি।

সেই কারণে জুলাই সনদ এখনো বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিবর্তনের একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রাখে। তবে সেই সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হবে তখনই, যখন রাজনৈতিক দলগুলো সনদটিকে নিজেদের রাজনৈতিক বিজয় প্রতিষ্ঠার অস্ত্র হিসেবে নয়, বরং আরও বিস্তৃত জাতীয় সংলাপ, সমঝোতা ও সংস্কারের সূচনাবিন্দু হিসেবে বিবেচনা করবে।

জুলাই সনদের উদ্দেশ্য যদি সত্যিই রাষ্ট্র সংস্কার ও জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা হয়, তাহলে এর পথ হতে হবে অন্তর্ভুক্তি, সংলাপ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার। অন্যথায়, যে দলিল দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার প্রত্যাশা জাগিয়েছে, সেটিই ভবিষ্যতে রাজনৈতিক বিভাজন আরও গভীর করার কারণ হয়ে উঠতে পারে।

সর্বশেষ হালনাগাদ 5 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version