অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
জ্বালানি তেলের খুচরা মূল্য বৃদ্ধি পেলেও আমদানি পর্যায়ে বিদ্যমান শুল্ক ও কর অপরিবর্তিত রাখার একটি নীতিগত চিন্তা করছে সরকার। মূলত বাজারে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণ ভোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমানোর লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
বর্তমান কাঠামো অনুযায়ী, প্রতি লিটার পেট্রলের খুচরা মূল্য যদি ১২০ টাকা হয়, তাহলে সরকার প্রায় ৩৮ টাকা রাজস্ব পায়। কিন্তু নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, খুচরা মূল্য ১৪০ টাকায় উন্নীত হলেও শুল্ক ও কর একই রাখা হতে পারে। স্বাভাবিকভাবে এ ক্ষেত্রে সরকারের রাজস্ব বেড়ে প্রায় ৪৫ টাকা হওয়ার কথা থাকলেও, তা না বাড়ালে ভোক্তারা প্রতি লিটারে প্রায় ৭ টাকা অতিরিক্ত চাপ থেকে রক্ষা পাবেন। যদিও এতে সরকারের রাজস্ব আয় কিছুটা কমে যেতে পারে, তবুও মূল্যস্ফীতির চাপ সামাল দিতে এটি একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করেন, জ্বালানির মূল্য বাড়লে তা সরাসরি পরিবহন, উৎপাদন ও বাজারব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলে, যার ফলে সামগ্রিকভাবে পণ্যের দাম বেড়ে যায়। তবে শুল্ক ও কর অপরিবর্তিত রাখলে সেই চাপ কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। এই প্রেক্ষাপটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে সম্ভাব্য রাজস্ব প্রভাব বিশ্লেষণ করে দ্রুত একটি প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারের আর্থিক ও মুদ্রানীতি সংক্রান্ত সমন্বয় সভায় এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। একই সভায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানিকারকদের অতিরিক্ত খরচ কমানো এবং পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থায় অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হ্রাসের নির্দেশনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এছাড়া নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর ভ্যাট ও আমদানি শুল্ক ধীরে ধীরে কমানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় দেশে এই ধরনের পণ্যে শুল্ক-কর তুলনামূলক বেশি, যা কমানো হলে বাজারে স্বস্তি আসতে পারে। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীরা যাতে অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়াতে না পারেন, সে বিষয়েও নজরদারি জোরদারের পরিকল্পনা রয়েছে।
বর্তমানে জ্বালানি আমদানির ওপর ৩২ শতাংশের বেশি কর ও শুল্ক আরোপিত রয়েছে, যা থেকে বছরে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় আমদানি ব্যয় বেড়েছে, ফলে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণও বেড়েছে। এ অবস্থায় জ্বালানি খাতে আরোপিত কর কমানোর বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চললেও, রাজস্ব কমে যাওয়ার আশঙ্কায় তা বাস্তবায়ন করা হয়নি।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ভর্তুকি কমানোর জন্য সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। এর ফলে জ্বালানির দাম সমন্বয় করা প্রায় অনিবার্য হয়ে উঠেছে। তবে কর ও শুল্ক অপরিবর্তিত রেখে এই মূল্য সমন্বয় করলে সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব কিছুটা কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
এর পাশাপাশি, অর্থনীতি পুনরুজ্জীবনের অংশ হিসেবে বন্ধ ও রুগ্ন শিল্পকারখানা পুনরায় চালু করতে একটি বড় তহবিল গঠনের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। এই তহবিল গঠনে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এবং এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক-এর মতো উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ঋণ সহায়তা নেওয়ার চিন্তা করা হচ্ছে।
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সরকার একটি বড় আকারের বাজেট প্রণয়নের পরিকল্পনা করছে, যার পরিমাণ ৯.২০ লাখ কোটি টাকারও বেশি হতে পারে। এই বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক সুরক্ষা জোরদারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি, ভর্তুকি বৃদ্ধি, ঋণের সুদ পরিশোধ এবং সরকারি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বাজেটের আকার বড় হচ্ছে।
অর্থনৈতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশের মধ্যে রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি ৬.২ থেকে ৬.৫ শতাংশের মধ্যে রাখার পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যদিও বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।
সামগ্রিকভাবে দেখা যায়, জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধির বাস্তবতা মেনে নিয়েও সরকার কর ও শুল্ক অপরিবর্তিত রেখে একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণের চেষ্টা করছে। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন রাজস্ব কাঠামো বজায় রাখা হচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ কমানোর প্রচেষ্টাও অব্যাহত রয়েছে।●
অকা/জ্বা/ই/সকাল/১২ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 6 hours আগে

