অর্থকাগজ প্রতিবেদন
দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে সরকারের ব্যাংক ঋণের খরচ আগের চেয়ে অনেকটাই বেড়ে গেছে। রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকটের আশঙ্কায় এখন সরকারকে উচ্চ সুদে ঋণ নিতে হচ্ছে। অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা মনে করছেন, সরকারের ঋণের চাহিদা ব্যাংকগুলোর সক্ষমতার চেয়ে বেশি হয়ে যাওয়ায় ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদের হার ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। এর ফলে সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের ঋণের সুদের ওপরেও বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ট্রেজারি বন্ডের বর্তমান চিত্র ও ক্রমবর্ধমান খরচ
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২১ এপ্রিল মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত নিলামে ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার বেড়ে ১০ দশমিক ৯৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এই উচ্চ হারেই সরকার বাজার থেকে ৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। উল্লেখ্য যে, গত মার্চ মাসেও এই সুদের হার ছিল ১০ দশমিক ২৫ শতাংশ। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে সুদের হারের এই বৃদ্ধি ইঙ্গিত দেয় যে, সরকার এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ব্যয়বহুল ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। মূলত ফ্যামিলি কার্ডসহ সরকারের বিভিন্ন সামাজিক ও উন্নয়নমূলক প্রকল্পের ব্যয় মেটাতে গিয়ে অর্থের যে বিশাল চাহিদা তৈরি হয়েছে, তা পূরণ করতে ব্যাংক ঋণের ওপর চাপ বাড়ছে।
রাজস্ব ঘাটতি ও লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থতা
সরকারের এই ঋণ নির্ভরতার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থতাকে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই থেকে মার্চ) লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব ঘাটতি রেকর্ড ৯৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অর্থবছরের বাকি তিন মাসে এই ঘাটতি আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থবছর শেষে এই ঘাটতির পরিমাণ ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। রাজস্ব আদায়ের এই স্থবিরতা সরকারকে বাধ্য করছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে নির্ধারিত সীমার চেয়েও বেশি অর্থ ধার করতে।
তারল্য সংকট ও ব্যাংকগুলোর অবস্থান
কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তাদের মতে, ব্যাংকিং খাতে বর্তমানে উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ খুব একটা সন্তোষজনক নয়। এই পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলো সরকারকে সস্তায় বা কম সুদে ঋণ দিতে অনাগ্রহ দেখাচ্ছে। চলতি অর্থবছরের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত তথ্যে দেখা গেছে, সরকার ইতোমধ্যেই ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১২ হাজার ৭৬১ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, যা বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রার ১০৮ শতাংশ। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ঋণ নেওয়ায় বাজার থেকে অর্থ শুষে নেওয়া হচ্ছে, যার ফলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের প্রাপ্যতা যেমন কমছে, তেমনি সুদের হারও ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে।
বেসরকারি খাতে ঋণের স্থবিরতা ও বিনিয়োগ শঙ্কা
ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো এখন বেসরকারি খাতে ঋণ দেওয়ার চেয়ে সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করাকে বেশি নিরাপদ ও লাভজনক মনে করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি টানা দুই মাস ৬ দশমিক ০৩ শতাংশে স্থির রয়েছে। নতুন বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণ কমে যাওয়ায় উদ্যোক্তারাও ঋণ নিতে উৎসাহ হারাচ্ছেন। অন্যদিকে, ট্রেজারি বন্ডের সুদ হার যখন কোনো ঋণের বেঞ্চমার্ক হিসেবে কাজ করে, তখন সাধারণ ঋণের সুদের হার কমানোর যে পরিকল্পনা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছিল, তা বাস্তবায়ন করা বর্তমান প্রেক্ষাপটে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রভাব ও বিশেষজ্ঞ মত
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রাজস্ব ঘাটতি না কমলে সরকারকে আরও বেশি ঋণ নিতে হবে, যা সুদের হারকে আরও উসকে দেবে। উচ্চ সুদের হারের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প খাতের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। যদি এই প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তবে নতুন বিনিয়োগ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এমতাবস্থায়, সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং রাজস্ব আদায় বাড়ানোর মাধ্যমেই কেবল এই ঋণের দুষ্টচক্র থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।


