অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
২০২৫ সালে বাংলাদেশের শেয়ার বাজার বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। বরং বছরের অধিকাংশ সময় জুড়ে ছিল সতর্কতা, অনিশ্চয়তা ও মূলধন প্রত্যাহারের প্রবণতা। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ-এর হালনাগাদ তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত এক বছরে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নিট প্রায় ২৭০ কোটি টাকা বাজার থেকে তুলে নিয়েছেন। এ সময়ে তাদের মোট বিক্রয় ছিল ২ হাজার ৯৫ কোটি ৩৪ লাখ টাকা, বিপরীতে ক্রয় ছিল ১ হাজার ৮২৫ কোটি ৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ বিদেশি অংশগ্রহণ ছিল, কিন্তু তা ছিল নিট বিক্রয়মুখী—যা সামষ্টিক আস্থার ঘাটতির স্পষ্ট প্রতিফলন।
২০২৫ সালের প্রেক্ষাপটে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি ছিল চাপের মুখে। ডলার সংকট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি এবং আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। আন্তর্জাতিক ফান্ড ম্যানেজাররা ঝুঁকি-সমন্বিত মুনাফা বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেন; তাই তারা নীতিগত স্থিতিশীলতা, মুদ্রা ঝুঁকি এবং বাজার থেকে সহজে বেরিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা—এই তিন সূচক বিশ্লেষণ করে। গত বছর এই তিন ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ কিছুটা চাপের মুখে ছিল। ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বড় আকারে নতুন অবস্থান নেওয়ার বদলে অপেক্ষাকৃত রক্ষণশীল কৌশল অবলম্বন করেন। বিশেষ করে বছরের শেষ দিকে তারা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শেয়ার বিক্রি করে মূলধন প্রত্যাহার করেন, যা বাজারের সূচক ও লেনদেন উভয়ের ওপর প্রভাব ফেলে।
তবে ২০২৬ সালের নির্বাচন শেষে পরিস্থিতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। চলতি ফেব্রুয়ারির প্রথম ১৫ দিনের উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বিদেশি লেনদেন প্রায় ৪৮ শতাংশ বেড়েছে। বিদেশি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনায় সংশ্লিষ্ট একটি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নির্বাচনের পর নীতিগত ধারাবাহিকতা ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতার বার্তা বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়িয়েছে। ফলে তারা আবার মৌলভিত্তি শক্তিশালী ও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই কোম্পানির শেয়ার কেনায় আগ্রহ দেখাচ্ছেন। চলতি মাসেই বিদেশি নিট বিনিয়োগ ইতিবাচক হতে পারে বলে বাজারে আশাবাদ তৈরি হয়েছে।
তবে সাময়িক আস্থার বাইরে গিয়ে বড় চিত্রটি বিবেচনা করলে দেখা যায়, সমস্যাটি কাঠামোগত। শেয়ার বাজারের গত আট বছরের পরিসংখ্যানে সাত বছরই বিদেশি নিট বিনিয়োগ নেতিবাচক ছিল; কেবল ২০২৩ সালে প্রায় ৬৪ কোটি টাকার নিট ইতিবাচক প্রবাহ দেখা যায়। এটি প্রমাণ করে যে বিদেশি মূলধন টানার ক্ষেত্রে ধারাবাহিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বাজারে বড় মূলধনী, স্বচ্ছ ও উচ্চ মানসম্পন্ন কোম্পানির ঘাটতি অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। রাষ্ট্রায়ত্ত লাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলো তালিকাভুক্ত না হওয়ায় বাজারের গভীরতা ও প্রাতিষ্ঠানিক গ্রহণযোগ্যতা সীমিত রয়েছে।
২০২৪ সালে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন কারসাজি দমনে কঠোর অবস্থান নেয় এবং সংস্কারমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করে। দীর্ঘমেয়াদে এটি ইতিবাচক ভিত্তি তৈরি করলেও স্বল্পমেয়াদে বাজারে কিছু অস্থিরতা দেখা দেয়। এর প্রভাবে আইপিওর গতি কমে যায় এবং নতুন তহবিল সংগ্রহে স্থবিরতা তৈরি হয়। ফলে বাজারে নতুন ও মানসম্পন্ন সম্পদের সরবরাহ বাড়েনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশি তহবিলের টেকসই প্রবাহ নিশ্চিত করতে হলে করপোরেট গভর্ন্যান্স জোরদার, আর্থিক প্রতিবেদন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং সংখ্যালঘু শেয়ারহোল্ডারদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি বড় ও লাভজনক সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধাপে ধাপে তালিকাভুক্ত করলে বাজারের গভীরতা বাড়বে এবং সূচকভিত্তিক আন্তর্জাতিক ফান্ডের অংশগ্রহণ সহজ হবে। একই সঙ্গে মুদ্রানীতি, করনীতি ও পুঁজি প্রত্যাহার সংক্রান্ত বিধিতে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা প্রয়োজন।
বর্তমানে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা উদীয়মান ও ফ্রন্টিয়ার বাজারে বিকল্প খুঁজছেন। বাংলাদেশ যদি নীতিগত স্থিতিশীলতা, স্বচ্ছতা এবং মানসম্পন্ন বিনিয়োগযোগ্য সম্পদের যোগান নিশ্চিত করতে পারে, তবে নির্বাচন-পরবর্তী ইতিবাচক সংকেতকে দীর্ঘমেয়াদি প্রবাহে রূপ দেওয়া সম্ভব। অন্যথায় আস্থার এই সাময়িক উত্থান স্থায়ী ভিত্তি পাবে না, এবং বিদেশি বিনিয়োগ আবারও অনিশ্চয়তার ছায়ায় ফিরে যেতে পারে। ●
অকা/পুঁবা/ই/সকাল/২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 1 day আগে

