অর্থকাগজ ডেস্ক

একসময় পরিবেশ দূষণের প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত প্লাস্টিক বর্জ্য এখন বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে। ব্যবহৃত প্লাস্টিককে পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করে নতুন পণ্যের কাঁচামালে রূপান্তরের মাধ্যমে দেশে ধীরে ধীরে বিকশিত হচ্ছে একটি সার্কুলার বা চক্রাকার অর্থনীতি, যেখানে বর্জ্য আর ফেলে দেওয়া উপাদান নয়; বরং উৎপাদন ও শিল্পায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। এর ফলে যেমন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে, তেমনি কমছে আমদানিনির্ভরতা এবং সাশ্রয় হচ্ছে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা।

খাতসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রায় এক হাজার প্রতিষ্ঠান প্লাস্টিক রিসাইক্লিং কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান বছরে প্রায় চার লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য পুনর্ব্যবহার করছে। তবে এই শিল্পের একটি বড় অংশ এখনও অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারনির্ভর। বর্জ্য সংগ্রহকারী, ভ্যানচালক, টোকাই ও ছোট আড়তদারদের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক সংগ্রহ হয়ে পুনরায় উৎপাদন ব্যবস্থায় ফিরে আসছে। ফলে শিল্পটির অর্থনৈতিক গুরুত্ব বাড়লেও এর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এখনও পুরোপুরি সুসংগঠিত হয়নি।

বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ টন প্লাস্টিক কাঁচামাল বা পলিমার রেজিন আমদানি করা হয়। পলিপ্রোপিলিন, পলিইথিলিন, পিভিসি, পিইটি, পলিস্টাইরিন ও এবিএসসহ বিভিন্ন ধরনের কাঁচামালের জন্য প্রায় সম্পূর্ণভাবে বিদেশি উৎসের ওপর নির্ভর করতে হয়। কারণ দেশে এখনও বড় পরিসরের কোনো পেট্রোকেমিক্যাল বা পলিমার উৎপাদন শিল্প গড়ে ওঠেনি। অথচ শুধু গৃহস্থালি প্লাস্টিক পণ্যের বাজারের আকারই বর্তমানে প্রায় সাড়ে পাঁচ থেকে ছয় হাজার কোটি টাকা। ফলে রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে কাঁচামালের একটি অংশ স্থানীয়ভাবে পুনরুদ্ধার করা গেলে আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

ব্যবসায়ীদের মতে, ব্যবহৃত প্লাস্টিকের বড় অংশ ১০ থেকে ৫০ বার পর্যন্ত পুনর্ব্যবহার করা যায়। কিন্তু কার্যকর সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থার অভাবে বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য এখনও নদী, খাল, নালা ও উন্মুক্ত পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় দৈনিক প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণ ২০০৫ সালের ১৭৮ টন থেকে ২০২০ সালে বেড়ে ৬৪৬ টনে পৌঁছেছে। অর্থাৎ মাত্র ১৫ বছরে এ বর্জ্যের পরিমাণ সাড়ে তিন গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে রাজধানীর একজন বাসিন্দা বছরে গড়ে প্রায় ২২ দশমিক ৫ কেজি প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদন করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ক্রমবর্ধমান বর্জ্যই সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দেশের শিল্পখাতের গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালে পরিণত হতে পারে।

প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদান পুনরুদ্ধারের হার নির্ভর করে প্লাস্টিকের ধরন, দূষণের মাত্রা, বাছাই প্রক্রিয়া, ধোয়ার মান এবং ব্যবহৃত প্রযুক্তির ওপর। দেশে প্রচলিত প্রযুক্তিতে সাধারণত এক কেজি প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে ৭০০ থেকে ৯০০ গ্রাম পর্যন্ত ব্যবহারযোগ্য পুনর্ব্যবহৃত উপাদান পাওয়া যায়। অর্থাৎ বর্তমানে যে বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য পরিবেশে নষ্ট হচ্ছে, তার একটি বড় অংশ শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব।

দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ২০১২ সালে রিসাইক্লিং কার্যক্রম শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে বছরে প্রায় ৬৯ হাজার টন প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার করছে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, তাদের ব্যবহৃত মোট প্লাস্টিক কাঁচামালের প্রায় ১৫ শতাংশ আসে পুনর্ব্যবহৃত উৎস থেকে। এই পরিমাণ কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হলে বছরে ৪০০ কোটির টাকারও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হতো। ফলে রিসাইক্লিং শুধু পরিবেশ সুরক্ষাই নয়, জাতীয় অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জে গড়ে ওঠা শিল্পপার্কে প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি পরিচালিত হচ্ছে দেশের অন্যতম বৃহৎ আধুনিক রিসাইক্লিং প্ল্যান্ট। সেখানে উৎপাদন, বাজারজাতকরণ, ব্যবহার-পরবর্তী বর্জ্য সংগ্রহ, পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ এবং পুনরায় নতুন পণ্য তৈরির পুরো চক্রটি একই ব্যবস্থাপনার আওতায় পরিচালিত হচ্ছে। এ কার্যক্রমে সরাসরি প্রায় ১ হাজার ২০০ এবং পরোক্ষভাবে প্রায় ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি দেশের বিভিন্ন স্থানে ১২টি প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ কেন্দ্র পরিচালনা করছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে এ সংখ্যা ১০০-তে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

পিইটি প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। বাংলাদেশ পেট্রোকেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেড (বিপিসিএল) বছরে প্রায় ১০ হাজার টন পিইটি প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার করছে। আন্তর্জাতিক মানের বিভিন্ন সনদপ্রাপ্ত এই প্রতিষ্ঠানটির মতে, পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিক কাঁচামাল রপ্তানিতে কিছু সুবিধা থাকলেও দেশে মূল্য সংযোজনমূলক শিল্পে ব্যবহারের জন্য তেমন কোনো প্রণোদনা নেই। ফলে স্থানীয় শিল্পের সম্প্রসারণ প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না।

প্লাস্টিক শিল্পের সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার প্লাস্টিক পণ্যের বাজার রয়েছে। সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি কারখানায় সরাসরি ২০ লাখেরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিবছর প্রায় ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের প্লাস্টিক পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, রিসাইক্লিং খাতকে আরও শক্তিশালী করা গেলে পরিবেশ সুরক্ষার পাশাপাশি কর্মসংস্থান, রপ্তানি আয় এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে এর অবদান আরও বহুগুণ বাড়বে।

তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। উন্নত দেশগুলোতে রিসাইক্লিং শিল্পে কর ছাড়, ভর্তুকি, গ্রিন ফাইন্যান্স এবং বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা থাকলেও বাংলাদেশে এ ধরনের সুবিধা এখনও সীমিত। পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিক পণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপিত থাকায় অনেক উদ্যোক্তা বৃহৎ বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন। পাশাপাশি বর্জ্য সংগ্রহ ও পৃথকীকরণ ব্যবস্থার দুর্বলতা শিল্পটির সম্প্রসারণে বড় বাধা হয়ে রয়েছে।

পরিবেশবিদরা আরও সতর্ক করে বলছেন, অনিয়ন্ত্রিত ও অপ্রাতিষ্ঠানিক রিসাইক্লিং কার্যক্রম থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক, ন্যানো ফাইবার ও বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান পরিবেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা মানবস্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে। তাই শুধু রিসাইক্লিংয়ের পরিমাণ বাড়ালেই হবে না, এর সঙ্গে পরিবেশগত নিরাপত্তা এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারও নিশ্চিত করতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্যকর নীতিগত সহায়তা, কর-সুবিধা, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, উন্নত সংগ্রহ নেটওয়ার্ক, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে প্লাস্টিক রিসাইক্লিং শিল্প বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় সবুজ শিল্পে পরিণত হতে পারে। তখন পরিবেশের জন্য হুমকি হিসেবে পরিচিত প্লাস্টিক বর্জ্যই দেশের অর্থনীতি, শিল্পায়ন ও টেকসই উন্নয়নের নতুন শক্তিতে রূপ নেবে। বর্জ্য আর বোঝা হবে না; বরং তা হয়ে উঠবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির এক নতুন ভিত্তি।

 

সর্বশেষ হালনাগাদ 6 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version