বিশেষ প্রতিনিধি

সরকারের ছয় মাসের পথচলায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলোর একটি হয়ে উঠেছে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক। পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, আঞ্চলিক যোগাযোগ এবং কূটনৈতিক ভারসাম্য—সবকিছুর সঙ্গেই ভারত সম্পর্কিত। ফলে আবেগ বা রাজনৈতিক অবস্থানের চেয়ে বাস্তবতা ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েই এ সম্পর্ককে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে এখন সেই কঠিন কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে।

তার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার দেশ পরিচালনায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তাভাবনা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার কথা বলছে। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় কোনো রাষ্ট্রই এককভাবে টিকে থাকতে বা এগিয়ে যেতে পারে না। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশের জন্য ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অপরিহার্য। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ঐতিহাসিক ভিত্তি—‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি। অর্থাৎ কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রথম বিবেচ্য হতে হবে বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ। যে সম্পর্ক দেশের অর্থনীতি, নিরাপত্তা, বাণিজ্য, জ্বালানি, যোগাযোগ ও সামগ্রিক উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে, বাংলাদেশকে সেই সম্পর্কই এগিয়ে নিতে হবে।

পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বাস্তব সত্য হলো—প্রতিবেশী পরিবর্তন করা যায় না। প্রতিবেশীর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক যেমন সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে, তেমনি বাণিজ্য, যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার পথও প্রশস্ত করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের গুরুত্ব তাই অন্য অনেক দেশের তুলনায় আলাদা। দুই দেশের দীর্ঘ সীমান্ত, অভিন্ন নদী, বাণিজ্য, জ্বালানি, যোগাযোগ, নিরাপত্তা ও মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগের কারণে ভারতকে উপেক্ষা করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করা বাস্তবসম্মত নয়।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সহযোগিতা বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। স্বাধীনতার পর দুই দেশের সম্পর্ক কখনো উষ্ণ হয়েছে, কখনো আবার নানা কারণে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দুই দেশের সম্পর্কে যে শীতলতা তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে উঠতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর একই বছরের ২১ ডিসেম্বর তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাইয়ের আমন্ত্রণে ভারত সফর করেন জিয়াউর রহমান। তাঁর ভারত সফর নিয়ে নিজ সরকারের ভেতরেও ভিন্নমত ছিল। কিন্তু তিনি রাজনৈতিক হিসাবের চেয়ে জাতীয় স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। সেই সফরের ধারাবাহিকতায় গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে যে চুক্তি হয়েছিল, তা বাংলাদেশের পানিস্বার্থের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অর্জন হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতির আরেকটি বৈশিষ্ট্য ছিল বহুমাত্রিক সম্পর্ক গড়ে তোলা। জাপান ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং জনশক্তি রপ্তানির নতুন সুযোগ সৃষ্টি—সবকিছুর পেছনেই ছিল বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ। ভারতের সঙ্গে পানিবণ্টন ও বাণিজ্যিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও তিনি বাস্তববাদী অবস্থান নিয়েছিলেন। অর্থাৎ কোনো একটি দেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা নয়, বরং জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলাই ছিল তাঁর কূটনৈতিক দর্শনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

বেগম খালেদা জিয়ার পররাষ্ট্রনীতিতেও একই ধরনের বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি দেখা যায়। ১৯৯১ সালে সরকার গঠনের পর যুক্তরাষ্ট্র সফরের পরই তিনি ভারত সফর করেন। ২০০৬ সালেও তিনি ভারত সফর করেন। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল ২০১২ সালে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে তাঁর ভারত সফর। সাত দিনের ওই সফরে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে তিনি বৈঠক করেন এবং দেশটির পক্ষ থেকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও সম্মান পান।

সে সময় বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের শরিকদের একটি অংশ এবং দলের ভেতরের অনেকে ভারত সফর নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়া রাজনৈতিক চাপের পরিবর্তে নিজের বিবেচনাকে প্রাধান্য দিয়ে সফরটি করেন। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, বিএনপি ভারতবিরোধিতার রাজনীতি করে না। রাষ্ট্রীয় স্বার্থে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা তিনি তখনও উপলব্ধি করেছিলেন।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার সেই বাস্তববাদী কূটনৈতিক ধারার উত্তরসূরি হিসেবে এখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে একই ধরনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। তাঁর সরকারের ঘোষিত ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির বাস্তব প্রয়োগ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এমন জায়গাতেই, যেখানে আবেগ, রাজনৈতিক চাপ এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়।

দুঃখজনকভাবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে নানা অসংগতি তৈরি হয়েছিল। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার দেশের স্বার্থের চেয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা ও ব্যক্তিগত বৈশ্বিক ভাবমূর্তিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে—এমন অভিযোগও উঠেছিল। ‘বিশ্ব আমাদের কাছে আসবে’—এমন প্রত্যাশার কথা বলা হলেও বাস্তবে বাংলাদেশের কূটনৈতিক পরিসর অনেক ক্ষেত্রে সংকুচিত হয়েছে।

বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতিতে বাংলাদেশের কোনো দৃশ্যমান লাভ হয়নি। বরং বাণিজ্য, ভিসা, সীমান্ত, যোগাযোগ এবং মানুষের পারস্পরিক যাতায়াতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিভিন্ন সময়ে তৎকালীন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ভারতবিরোধী বক্তব্যও দুই দেশের সম্পর্কে অস্বস্তি বাড়িয়েছে। ভারতের সঙ্গে ‘অসম চুক্তি’ বাতিলের ঘোষণা দেওয়া হলেও বাস্তবে বড় ধরনের কোনো চুক্তি বাতিল হয়নি। একইভাবে আদানি বিদ্যুৎ চুক্তি বাতিলের আলোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তব রূপ পায়নি।

চীন সফরের সময় উত্তর-পূর্ব ভারতের ‘সেভেন সিস্টার্স’ নিয়ে ড. ইউনূসের মন্তব্যও দুই দেশের সম্পর্কে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছিল। একটি রাষ্ট্রের সরকারপ্রধানের বক্তব্য প্রতিবেশী দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হলে তার কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। এ ধরনের বক্তব্যের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আরও অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে।

এরই মধ্যে ভারত বাংলাদেশের পণ্যের জন্য নির্দিষ্ট বন্দর ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করে। এতে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। ভিসা কার্যক্রমও দীর্ঘ সময় কার্যত সীমিত ছিল। চিকিৎসা, শিক্ষা ও ব্যবসার প্রয়োজনে ভারতে যাতায়াতকারী বাংলাদেশিদের ভোগান্তি বাড়ে। সীমান্তে বিভিন্ন সময়ে উত্তেজনা তৈরি হয়। দুই দেশের সম্পর্কের এই অবনতিতে বাংলাদেশের অর্থনীতি বা সাধারণ মানুষের কোনো স্থায়ী সুবিধা তৈরি হয়নি।

এমনকি দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েনের প্রভাব ক্রীড়াঙ্গনেও পড়েছে। বিশ্বকাপ ক্রিকেটের মতো বড় আন্তর্জাতিক আয়োজনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়া দেশের ক্রীড়া ভাবমূর্তির জন্যও ইতিবাচক ছিল না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দীর্ঘদিনের একটি প্রতিবেশী সম্পর্কের অবনতি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিতেও প্রশ্ন তৈরি করে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি পরিবর্তনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শংকর বাংলাদেশে এসে শোক ও সমবেদনা জানান। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁকে অভিনন্দন জানান এবং দুই দেশের সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। বাংলাদেশের নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠানেও ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিরালার উপস্থিতি ছিল তাৎপর্যপূর্ণ।

এরপরও বিভিন্ন উপলক্ষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন এবং ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। একই সময়ে ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আগ্রহের কথাও জানিয়েছে। বাংলাদেশের জন্যও এটি একটি সুযোগ—দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে আস্থা তৈরি করার।

ভারতের পক্ষ থেকে দিনেশ ত্রিবেদীর মতো একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদকে বাংলাদেশে হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া এবং ভিসা কার্যক্রম পুনরায় চালুর উদ্যোগ সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ইঙ্গিত বহন করে। জ্বালানি সংকটের সময় ভারত বাংলাদেশের পাশে থাকার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। গ্যাস ও জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। দেশের বাজারে কাঁচা মরিচের সংকট তৈরি হলে ভারত থেকে আমদানির সুযোগ তৈরি হওয়ায় বাজার পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে। এসব ছোট ঘটনা হলেও এগুলো দুই দেশের পারস্পরিক নির্ভরতার বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।

বাংলাদেশের জন্য ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের গুরুত্ব কেবল রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক নয়; এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত দেশের অর্থনীতি। বাংলাদেশের পোশাক ও উৎপাদন খাতের বিভিন্ন শিল্পে তুলা, সুতা, কাপড়, রাসায়নিক, রং, যন্ত্রপাতি, যন্ত্রাংশসহ নানা ধরনের কাঁচামাল ও উপকরণের প্রয়োজন হয়। ভারতের ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে এসব পণ্য দ্রুত ও তুলনামূলক কম খরচে আনা সম্ভব। সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে বিকল্প হিসেবে চীন বা দূরবর্তী কোনো বাজার থেকে পণ্য আনতে পরিবহন ব্যয় বাড়বে, সময় বেশি লাগবে এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বেশি মজুত রাখতে হবে।

এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত উৎপাদন ব্যয় ও রপ্তানি প্রতিযোগিতায় পড়বে। বাংলাদেশের শিল্পের একটি বড় সুবিধা হলো ভৌগোলিক অবস্থান। সড়ক, রেল, নৌপথ এবং সীমান্ত বাণিজ্যের মাধ্যমে ভারতীয় বাজারের পাশাপাশি নেপাল, ভুটান ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বাজারেও প্রবেশের সুযোগ রয়েছে। আঞ্চলিক যোগাযোগ ও ট্রানজিট ব্যবস্থার ক্ষেত্রে ভারতের সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সম্পর্কের অবনতি হলে এসব সম্ভাবনাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

পানিবণ্টন, জ্বালানি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য, ট্রানজিট, নিরাপত্তা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থ জড়িত। ভারত বাংলাদেশের জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, বাংলাদেশও ভারতের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাই সম্পর্কটি একতরফা নির্ভরতার নয়; বরং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে পরিচালনা করার সুযোগ রয়েছে।

নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, চোরাচালান, মানব পাচার, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ, সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় দুই দেশের মধ্যে তথ্য ও সহযোগিতা বিনিময় গুরুত্বপূর্ণ। এই সহযোগিতা দুর্বল হলে উভয় দেশই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

অবশ্যই এর অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশের সব বিষয়ে ভারতের সঙ্গে একমত হতে হবে। সীমান্তে হত্যা, পানির ন্যায্য হিস্যা, বাণিজ্য বৈষম্য, পণ্যবাজারে বিধিনিষেধ কিংবা যেকোনো অসম চুক্তির বিষয়ে বাংলাদেশকে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে আপস না করেই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা সম্ভব। বরং কূটনীতির প্রকৃত সাফল্য এখানেই—বন্ধুত্ব থাকবে, কিন্তু জাতীয় স্বার্থও সুরক্ষিত থাকবে।

বাংলাদেশের সামনে তাই ভারতকে বেছে নেওয়া অথবা অন্য কোনো শক্তিকে বেছে নেওয়ার প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হলো, কীভাবে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্যসহ সব অংশীদারের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রেখে বাংলাদেশের স্বার্থ সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিশ্চিত করা যায়। ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির প্রকৃত অর্থও সেটিই।

এই বাস্তবতার বিপরীতে দেশের ভেতর থেকে যদি কেউ সরকারকে অতিরিক্ত ভারতবিরোধী অবস্থানের দিকে ঠেলে দিতে চায়, তাহলে প্রধানমন্ত্রীকে অবশ্যই সতর্ক হতে হবে। একটি দেশের সঙ্গে একটি বা একাধিক বিষয়ে মতবিরোধ থাকতেই পারে। কিন্তু একটি ইস্যুর কারণে সব ধরনের আলোচনা ও সহযোগিতার দরজা বন্ধ করে দেওয়া কোনো বিচক্ষণ কূটনীতি হতে পারে না।

ভারতবিরোধী মনোভাবকে রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার হাতিয়ার বানানোর ঝুঁকিও কম নয়। অতিরিক্ত সংঘাতমূলক অবস্থান রাজনৈতিক বিভাজন বাড়াতে পারে, ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে এবং অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার মধ্যে বাংলাদেশকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে একটি পক্ষের দিকে ঠেলে দেওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হবে।

বিএনপি একটি উদার ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজেদের পরিচয় দেয়। তাই দলটির নেতৃত্বাধীন সরকারের পররাষ্ট্রনীতিতেও বাস্তববাদ, ভারসাম্য এবং জাতীয় স্বার্থের প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন। ভারতবিরোধিতা দিয়ে নয়, বাংলাদেশের স্বার্থ আদায় করার সক্ষমতা দিয়েই সরকারের কূটনৈতিক সাফল্য বিচার করা উচিত।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ রয়েছে। তিনি চাইলে জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার বাস্তববাদী পররাষ্ট্রনীতির ধারাকে আরও আধুনিক ও সময়োপযোগী করে এগিয়ে নিতে পারেন। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পাশাপাশি দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিটি বিষয়ে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া সম্ভব। আলোচনার টেবিলেই পানির হিস্যা, সীমান্ত, বাণিজ্য, জ্বালানি, যোগাযোগসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে বাংলাদেশের দাবি তুলে ধরতে হবে।

কূটনীতিতে মান-অভিমান কিংবা জেদের কোনো স্থায়ী মূল্য নেই। রাষ্ট্রের স্বার্থই সেখানে শেষ কথা। তাই ভারতের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণ গ্রহণ করে তারেক রহমানের ভারত সফর করা উচিত কি না—এই প্রশ্নের উত্তরও রাজনৈতিক আবেগ দিয়ে নয়, বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের আলোকে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের মানুষ এমন একটি পররাষ্ট্রনীতি চায়, যেখানে কোনো দেশের প্রতি অন্ধ আনুগত্য নেই, আবার অকারণ বৈরিতাও নেই। যেখানে বন্ধুত্ব থাকবে, কিন্তু আত্মসম্মান অক্ষুণ্ন থাকবে; সহযোগিতা থাকবে, কিন্তু জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দেওয়া হবে না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এখন এখানেই।

দেশের জনগণের প্রত্যাশা—তিনি কোনো পক্ষের চাপ বা আবেগের কাছে নতি স্বীকার করবেন না। বরং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং জনগণের কল্যাণকে সামনে রেখে নিজস্ব বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেবেন। শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলেই বাংলাদেশের স্বার্থ সবচেয়ে শক্তভাবে তুলে ধরতে হবে। আর সেই সিদ্ধান্তই হবে প্রকৃত অর্থে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ কূটনীতির প্রতিফলন।

সর্বশেষ হালনাগাদ 15 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version