মারুফা ইয়াসমিন অন্তরা ●
একটি দেশের অর্থনীতির মানচিত্র যখন কেবল গাণিতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে আঁকা হয়, তখন তার অন্তরালে লুকিয়ে থাকা বিষফোঁড়াগুলো অনেক সময় নজরে আসে না। গত ২৫ বছর ধরে একটি অদৃশ্য সমান্তরাল অর্থনীতি বা ‘শ্যাডো ইকোনমি’ আমাদের মূলধারার সমৃদ্ধিকে ক্রমাগত কুরে কুরে খাচ্ছে। এই অদৃশ্য দানবটির নাম হলো কালো টাকা। রাষ্ট্র বারবার সুযোগ দিয়েও যখন এই অর্থকে মূল স্রোতে ফেরাতে ব্যর্থ হয়, তখন বুঝতে হবে সংকটের শিকড় অনেক গভীরে। আজ একদিকে কালো টাকার মালিকদের পৌষ মাস, অন্যদিকে সাধারণ দিনমজুর থেকে শুরু করে মধ্যবিত্তের জীবন যেন এক অন্তহীন সর্বনাশ। মুদ্রাস্ফীতির যাতাকলে পিষ্ট সাধারণ মানুষের হাহাকার আর নীতিনির্ধারকদের কাগুজে উন্নয়নের মধ্যে যে যোজন যোজন দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তা সমাজকাঠামোর জন্য এক অশনি সংকেত। অর্থনীতি কেবল সংখ্যাতত্ত্ব নয়, এটি মানুষের জীবনের নিরাপত্তা ও আস্থার প্রতিফলন; অথচ বর্তমান অব্যবস্থাপনা সেই আস্থাকেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
গত আড়াই দশকে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে প্রায় প্রতি বছরই বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ২০০৫-০৬ অর্থবছর থেকে শুরু করে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে কখনও ১০ শতাংশ, কখনও ১৫ শতাংশ কর দিয়ে কোনো প্রশ্ন ছাড়াই অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু পরিসংখ্যানের বলছে এই সুযোগের সুফল দেশের পুঁজিবাজারে বা শিল্পোদ্যোগে প্রায় নগণ্য। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, গত ২০ বছরে যে পরিমাণ টাকা সাদা করা হয়েছে, তার সিংহভাগই বিনিয়োগ করা হয়েছে আবাসন খাতে অথবা নগদ আকারে রাখা হয়েছে। অথচ সরকারের লক্ষ্য ছিল এই অলস অর্থ পুঁজিবাজারে সঞ্চালিত হয়ে তারল্য সংকট দূর করবে। বাস্তবতা হলো যখনই কালো টাকা সাদা করার ঢালাও সুযোগ দেওয়া হয়, তখনই অর্থ পাচারের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৭৩ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। কালো টাকা আসলে কখনোই পুরোপুরি ‘সাদা’ হয়ে অর্থনীতির মূল চাকাকে গতিশীল করতে পারে না; বরং এটি দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত সম্পদকে বৈধতা দিয়ে আরও বড় দুর্নীতির পথ প্রশস্ত করে দেয়। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের এই অর্থ যখন বিদেশের রিয়েল এস্টেট বা অফশোর অ্যাকাউন্টে চলে যায়, তখন দেশের অর্থনীতি এক বিশাল রক্তক্ষরণের শিকার হয়।
এই অব্যবস্থাপনার আরেকটি অন্ধকার দিক হলো কর ব্যবস্থার চরম দুর্বলতা ও সাধারণ মানুষের ওপর বৈষম্যমূলক প্রভাব। কর ফাঁকি দেওয়ার সংস্কৃতি এখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। উদাহরণস্বরূপ, দেশের রেস্টুরেন্ট খাতের দিকে তাকালে এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে। বড় বড় রেস্টুরেন্টগুলো সরকারের কাছ থেকে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও আমদানিকৃত কাঁচামালের ওপর নানা ভর্তুকি ও সুবিধা গ্রহণ করলেও ভ্যাট বা মূসক আদায়ের ক্ষেত্রে চরম অস্বচ্ছতা বজায় রাখে। অনেক ক্ষেত্রে ইএফডি (EFD) মেশিন থাকা সত্ত্বেও কাস্টমারের নামে সঠিক ভ্যাট বিল দেওয়া হয় না। গ্রাহকের কাছ থেকে ভ্যাট কেটে রাখা হলেও তা সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করার অসংখ্য প্রমাণ পাওয়া যায়। ফলে ভোক্তা একদিকে ভ্যাট দিচ্ছেন, অন্যদিকে রাষ্ট্র তার ন্যায্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এই রাজস্ব ঘাটতি মেটাতে সরকার যখন পরোক্ষ করের বোঝা সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেয়, তখন বৈষম্য আরও বাড়ে। বর্তমানে এনবিআর-এর রাজস্ব আদায়ের প্রায় ৬৫ শতাংশ আসে পরোক্ষ কর থেকে, যা ধনীদের তুলনায় দরিদ্রদের ওপর বেশি প্রভাব ফেলে। কালো টাকার মালিকরা যেখানে ১৫ শতাংশ কর দিয়ে মুক্তি পাচ্ছেন, সেখানে একজন সাধারণ ভোক্তাকে সাবান থেকে শুরু করে চিনি কেনা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হচ্ছে—এটি চরম নিষ্ঠুরতা।
বর্তমান সময়ে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা মিলে সাধারণ মানুষের জীবনকে এক অসহনীয় পর্যায়ে নিয়ে গেছে। তেলের দাম বৃদ্ধির অজুহাতে পরিবহন খরচ থেকে শুরু করে নিত্যপণ্যের দাম যেভাবে বাড়ছে, তার কোনো যৌক্তিক নিয়ন্ত্রণ নেই। জনগণের নাভিশ্বাস রোধে সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরগুলো বছরের অধিকাংশ সময়ই নিরব থাকে!
চাল, ডাল, তেল ও শাকসবজির দাম এখন আকাশচুম্বী। বিআইডিএস (বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান) এর এক গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশে গত এক বছরে খাদ্য মুদ্রাস্ফীতি ১০ থেকে ১২ শতাংশ। একজন দিনমজুর যার প্রতিদিনের আয় ৫০০ টাকা, তার পক্ষে কেবল দুই বেলা চাল-ডাল জোগাড় করতেই সেই আয়ের বড় অংশ শেষ হয়ে যাচ্ছে। পুষ্টি তো দূরের কথা, পেট ভরে খাওয়ার নিশ্চয়তাটুকুও আজ বিপন্ন। প্রতিবেশী দেশ ভারতের তুলনায় আমাদের দেশে যাতায়াত ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনা করলে আঁতকে উঠতে হয়। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে যেখানে বাসে বা ট্রেনে ১০-২০ কিলোমিটার যাতায়াত করতে অত্যন্ত সামান্য অর্থ ব্যয় হয়, বাংলাদেশে সেই একই দূরত্বের খরচ তিন থেকে চার গুণ বেশি। পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, জ্বালানি তেল বা অন্য পণ্যের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে কম থাকলেও আমাদের দেশে ঠিক উল্টো চিত্র পরিলক্ষিত হয়! কিন্তু বৃদ্ধি হলে সময় তা মুহূর্তেই কার্যকর কর্ হয়। এই বৈষম্যমূলক নীতি কেবল ‘হ্যান্ড টু মাউথ’ শ্রেণির মানুষের নাভিশ্বাস তুলছে না, বরং তাদের দারিদ্র্যের অতল গহ্বরে ঠেলে দিচ্ছে।
কালো টাকার এই সংক্রামক ব্যাধি দেশের পুঁজিবাজারকেও পঙ্গু করে ফেলেছে। সাধারণ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা যখন তাদের কষ্টার্জিত অর্থ শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করেন, তখন তারা আশা করেন একটি স্বচ্ছ এবং আইনি কাঠামোবদ্ধ বাজার। কিন্তু কালো টাকার মালিকরা যখন এই বাজারে প্রবেশ করে, তারা মূলত কৃত্রিমভাবে শেয়ারের দাম বাড়িয়ে দিয়ে সাধারণ মানুষের পকেট কাটে। এই অপ্রদর্শিত অর্থ যখন বাজার থেকে তুলে নেওয়া হয়, তখন বাজার ধসে পড়ে এবং হাজার হাজার পরিবার নিঃস্ব হয়। গত ২৫ বছরের চিত্র বলছে, শেয়ার বাজারে কালো টাকা বিনিয়োগের কোনো সুনির্দিষ্ট ইতিবাচক ফলাফল নেই। বরং এটি বাজারকে আরও অস্থিতিশীল করেছে। এছাড়া কর ব্যবস্থার বিশৃঙ্খলা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, দেশের বড় বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো একাধিক ব্যালেন্স শিট তৈরি করে ট্যাক্স ফাঁকি দিচ্ছে। এক হিসাবে দেখা যায়, বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন (প্রায় ৮-৯ শতাংশ)। এর মূল কারণ হলো সম্পদশালীরা কর নেটের বাইরে থেকে যাচ্ছে, আর মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তরা পরোক্ষ কর হিসেবে ভ্যাট বা মূসক (মূল্য সংযোজন কর) এর মাধ্যমে জগদ্দল পাহাড়ের মতো বোঝা বইছে। সরকারের পক্ষ থেকে আইনি সংস্কারের কথা বলা হলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তা আলোর মুখ দেখে না।
বাংলাদেশ ব্যাংক যখন আর্থিক ব্যবস্থাপনায় অক্ষমতা দেখায়, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খায় এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেবল সুদের হার পরিবর্তনের মতো গৎবাঁধা নীতিতে আটকে থাকে, তখন সংকট আরও প্রকট হয়। মুদ্রাস্ফীতি শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, সুশাসনের অভাবও বড় সমস্যা। কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া মানে হলো সৎ করদাতাকে নিরুৎসাহিত করা এবং দুর্নীতিবাজকে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা দেওয়া। গত ২৫ বছরে এই সুযোগ দিয়ে বিনিয়োগের যে চিত্র আমাদের সামনে এসেছে, তা প্রমাণ করে যে এটি ব্যর্থ এক নীতি। এই নীতি কেবল গুটিকয়েক প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও কালো টাকার মালিকদের তুষ্ট করার হাতিয়ার। সরকারের রাজস্ব বিভাগের কর্তা ব্যক্তিরা যখন রেস্টুরেন্ট মালিকদের ভ্যাট ফাঁকি ধরতে পারে না কিংবা পরিবহন সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে থাকে, তখন রাষ্ট্রের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বাজার তদারকি ব্যবস্থা কেবল নামমাত্র অভিযানে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে, যার কোনো দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নেই। সিন্ডিকেটরা জানে যে তারা যত দামই বৃদ্ধি করুক না কেন, তাদের বিরুদ্ধে কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতিই আজ আমাদের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এর রিজার্ভ সংকট এবং মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার মানে ধস নামার পেছনেও এই কালো টাকা পাচারের ভূমিকা রয়েছে!
দেশের যাতায়াত ব্যবস্থার চিত্রটি আরও শোচনীয়। সাধারণ মানুষের জীবনের বড় একটি অংশ চলে যায় রাস্তায়। তেলের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাস ভাড়া হু হু করে বাড়লেও পরিবহন সেবার মান বাড়েনি। ভারতের দিল্লিতে বা কলকাতায় মেট্রো এবং লোকাল বাসের ভাড়া সাধারণের হাতের নাগালে থাকলেও আমাদের দেশে রিকশা ভাড়াই এখন অনেকের নাগালের বাইরে। স্বল্প দূরত্বের যাতায়াতে বাংলাদেশে যে পরিমাণ খরচ হয়, তা দিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় যাওয়া সম্ভব। এই উচ্চ যাতায়াত খরচ পরোক্ষভাবে বাজারে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। একজন ক্ষুদ্র কৃষক যখন তার পণ্য শহরে আনতে যান, তাকে ট্রাক ভাড়ার পেছনেই আয়ের অর্ধেক দিয়ে দিতে হয়। ফলে মধ্যস্বত্বভোগী বা ফড়িয়ারা লাভবান হলেও কৃষক ও ভোক্তা উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হন। মূল্যস্ফীতির যাতাকলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় এখন মানুষ সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছে, যা ভবিষ্যতের জন্য এক বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকি। ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার হার বেড়ে গেছে এবং সাধারণ মানুষের ডিপিএস বা সঞ্চয়পত্র ভাঙ্গার হার গত এক দশকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
অন্ধকার অর্থনীতির নাজুক এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে আমাদের কেবল নীতি নির্ধারণী পরিবর্তন নয়, বরং মানসিকতা ও জবাবদিহিতার আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। প্রথমত, বাজেটে কালো টাকা সাদা করার ঢালাও সুযোগ চিরতরে বন্ধ করতে হবে। যারা কর ফাঁকি দেয় বা অবৈধ অর্থ উপার্জন করে, তাদের জন্য করের হার হতে হবে সর্বোচ্চ এবং শাস্তির বিধান হতে হবে কঠোর। অপ্রদর্শিত অর্থ উদ্ধারে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এর গোয়েন্দা বিভাগকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে এবং কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বরদাশত করা যাবে না। দ্বিতীয়ত, ভ্যাট আদায়ের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় করতে হবে। বিশেষ করে রেস্টুরেন্ট ও খুচরা পর্যায়ে প্রতিটি লেনদেন যেন সরাসরি এনবিআর এর সার্ভারে জমা হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। যারা ভ্যাট ফাঁকি দেবে, তাদের লাইসেন্স বাতিলের মতো কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। ভোক্তা যিনি ভ্যাট দিবেন তার নামে বিল ও মূসক হবে। কর সেবার সে অঙ্ক কর পরিদর্শক গ্রহণ করবেন। করদাতার সঙ্গে তা সমন্বয় করতে হবে। সাধারণ মানুষকে ভ্যাট বিল চাওয়ার ক্ষেত্রে সচেতন হতে হবে এবং করদাতা ও কর আদায়ের পুরস্কারের ব্যবস্থা করতে হবে।
তৃতীয়ত, পরিবহন খাতে সিন্ডিকেট ভাঙতে সরকারি পরিবহন ব্যবস্থা (বিআরটিসি) আরও শক্তিশালী করতে হবে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর মতো স্বল্প দূরত্বের যাতায়াত খরচ কমানোর জন্য কার্যকর সাবসিডি বা রেগুলেটরি বডি গঠন করতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কেবল টাকা ছাপানো বা ডলার বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে স্বাধীন ও সাহসী ভূমিকা নিতে হবে। ব্যাংকিং খাতের লুটপাট ও খেলাপি ঋণ আদায় করতে না পারলে তারল্য সংকট কখনোই কাটবে না। এছাড়া গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে কৃষকদের সরাসরি বাজারজাতকরণের সুবিধা দিতে হবে, যাতে মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপট কমে। তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মাসিক ভিত্তিতে সমন্বয় করার ব্যবস্থাটি স্বচ্ছ হতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ এর সুফল পায়। অর্থপাচার রোধে বিএফআইইউ (বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট) এবং সিআইডি (ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট) এর সমন্বিত অভিযান প্রয়োজন।
দেশের স্বার্থে অব্যবস্থাপনার ক্ষতগুলোকে জরুরি নিরাময় অনিবার্য হয়ে পড়েছে।
কালো টাকা যখন মূল অর্থনীতিকে গ্রাস করে ফেলে, তখন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বও ঝুঁকির মুখে পড়ে। সাধারণ মানুষের ঘাম ঝরানো পয়সা যখন ভ্যাট ফাঁকির মাধ্যমে সিন্ডিকেটের পকেটে যায়, তখন তা কেবল অর্থনৈতিক অপরাধ নয়, বরং তা মানবাধিকারের লঙ্ঘনের পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়ায়। আমাদের মনে রাখতে হবে, কোনো জাতি কেবল দুর্নীতি আর বৈষম্যের ওপর ভিত্তি করে দীর্ঘস্থায়ী সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারে না। বর্তমান সংকট থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের প্রয়োজন স্বচ্ছতা, দেশপ্রেম এবং কঠোর জবাবদিহিতা। সরকারের উচিত হবে কেবল কালো টাকার মালিকদের তুষ্ট না করে সাধারণ দিনমজুর ও মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে মনোনিবেশ করা। বাজারের সিন্ডিকেট ভাঙা, কর ফাঁকি রোধ করা এবং পরিবহন খরচ এবং নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে আনা ছাড়া জনজীবনে স্বস্তি ফেরানো সম্ভব নয়। আমাদের সম্মিলিত প্রতিবাদ ও সচেতনতাই পারে এই অব্যবস্থাপনার অবসান ঘটিয়ে একটি ন্যায়ভিত্তিক ও স্থিতিশীল অর্থনীতি নিশ্চিত করতে। নতুবা মুল্যস্ফীতির এই আগুন একদিন পুরো সমাজব্যবস্থাকেই গ্রাস করে ফেলবে। কালো টাকার কবল থেকে মুক্ত হয়ে একটি স্বচ্ছ ও মানবিক অর্থনীতি গড়তে পারলেই কেবল নতুন প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য বাংলাদেশ রেখে যাওয়া সম্ভব হবে। নীতিনির্ধারকদের মনে রাখতে হবে, উন্নয়ন কেবল অবকাঠামোতে নয়, সত্যিকারের উন্নয়ন হলো আপামর জনসাধারণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিতকরণ। আর তা হলো অন্ন বস্ত্র বাসস্থানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। ●
মতামত লেখকের নিজস্ব

লেখক : কলাম লেখক ও বেসরকারি একটি কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা
antmail00111@gmail.com

সর্বশেষ হালনাগাদ 12 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version