অর্থকাগজ প্রতিবেদন
বাংলাদেশের শেয়ার বাজারে বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীদের আস্থা সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। চলতি বছরের জুন মাসে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিক্রির পরিমাণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, নীতিগত অনিশ্চয়তা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার বাড়তি হস্তক্ষেপ এবং সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সতর্কতা বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে বিদেশি তহবিল ব্যবস্থাপকরা ধীরে ধীরে বাংলাদেশি শেয়ার থেকে বিনিয়োগ সরিয়ে নিচ্ছেন।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে জানা গেছে, জুন মাসে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মাত্র ৬ কোটি টাকার শেয়ার কিনলেও বিক্রি করেছেন ৩৫৮ কোটি টাকার শেয়ার। ফলে মাসজুড়ে তাদের নিট বিক্রির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৫৮ কোটি টাকা, যা চলতি বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লেনদেনও সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম নিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, মে মাসে বিদেশিদের নিট শেয়ার বিক্রি ছিল ১৬১ কোটি টাকা এবং এপ্রিলে ছিল ১২৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে বিক্রির চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জুনে বিক্রির পরিমাণ মে মাসের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ এবং এপ্রিলের তুলনায় প্রায় তিন গুণ হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য অর্থ দেশে ফেরত নেওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করতে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি নিয়ম শিথিল করলেও তা কাঙ্ক্ষিত ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারেনি। বরং সাম্প্রতিক বিভিন্ন নীতিগত পরিবর্তন, নিয়ন্ত্রক নির্দেশনা এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ফলে তারা নতুন বিনিয়োগের পরিবর্তে বিদ্যমান বিনিয়োগ কমানোর পথ বেছে নিচ্ছেন।
ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের পোর্টফোলিওতে প্রায় ১৩০টি তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ার থাকলেও জুন মাসে তারা ১৯টি বড় কোম্পানির শেয়ার বিক্রি করেছেন। অন্যদিকে মাত্র ১৫টি প্রতিষ্ঠানে সীমিত পরিসরে নতুন বিনিয়োগ এসেছে, যা বাজারে নতুন আস্থার পরিবর্তে পোর্টফোলিও পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি বিক্রির চাপ পড়েছে বড় মূলধনী বা ব্লু-চিপ কোম্পানিগুলোর ওপর। জুনে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ব্র্যাক ব্যাংকের প্রায় ১৮৬ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করেছেন। এর ফলে ব্যাংকটিতে তাদের মালিকানার হার মে মাসের ৩৫ দশমিক ৮৯ শতাংশ থেকে কমে জুন শেষে ৩৪ দশমিক ৬৯ শতাংশে নেমে এসেছে।
এ ছাড়া গ্রামীণফোনে ৪২ কোটি টাকা, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসে ৩৫ কোটি টাকা, ম্যারিকো বাংলাদেশে ২৩ কোটি টাকা এবং রেনাটায় ১৬ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করেছেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। একই সময়ে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ (বিএটি) এবং বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাহার করা হয়েছে।
অন্যদিকে নতুন বিনিয়োগের তালিকায় ছিল হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। জুনে শাশা ডেনিমসে প্রায় ১ কোটি ২৪ লাখ টাকা, আইটিসিতে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ টাকা এবং প্রিমিয়ার সিমেন্টে প্রায় ১ কোটি টাকার নতুন বিনিয়োগ এসেছে। এছাড়া লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ, আইডিএলসি ফাইন্যান্স এবং যমুনা অয়েলেও সামান্য পরিমাণ বিদেশি অংশীদারিত্ব বেড়েছে। তবে বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এসব বিনিয়োগ বাজারে নতুন আস্থার প্রতিফলন নয়; বরং সীমিত পরিসরের পোর্টফোলিও সমন্বয়।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডিবিএ) সিনিয়র সহসভাপতি এবং প্রাইম ব্যাংক সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনিরুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক কয়েকটি নীতিগত সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুরকে অপসারণের ঘটনাকে অনেক বিদেশি তহবিল ব্যবস্থাপক দেশের অর্থনৈতিক নীতির ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরির একটি কারণ হিসেবে দেখছেন।
তার মতে, ব্যাংকের লভ্যাংশ ঘোষণার জন্য ন্যূনতম ২ হাজার কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনের শর্ত এবং আমানত ও ঋণের সুদের ব্যবধান সর্বোচ্চ ৪ শতাংশে সীমাবদ্ধ রাখার মতো সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক বাজার অর্থনীতির প্রচলিত নীতির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এতে ভালো পারফরম্যান্স করা ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডাররাও ক্ষতির মুখে পড়ছেন এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থাও দুর্বল হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রক হস্তক্ষেপ বাজারের স্বাভাবিক চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্যকে ব্যাহত করছে। এতে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে অধিক নিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ধারণা তৈরি হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগের জন্য নেতিবাচক বার্তা বহন করে।
উল্লেখ্য, বিদেশি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে গত ২০ মে বাংলাদেশ ব্যাংক বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রত্যাহারের প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনে। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিটি শেয়ার লেনদেনের ক্ষেত্রে পৃথকভাবে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের সনদ জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া হয়। এখন অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকগুলো মূলধনী মুনাফা কর কেটে সরাসরি অর্থ নন-রেসিডেন্ট ইনভেস্টর টাকা (নিটা) হিসাবে জমা দিতে পারে। এর ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অর্থ পুনর্বিনিয়োগ কিংবা দেশে ফেরত নেওয়ার প্রক্রিয়া সহজ হয়েছে। তবে নীতিগত এই সুবিধা সত্ত্বেও জুন মাসে বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাহারের প্রবণতা কমেনি; বরং তা আরও জোরালো হয়েছে, যা শেয়ার বাজারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সর্বশেষ হালনাগাদ 17 hours আগে

