বিশেষ প্রতিনিধি

দেশে জ্বালানি তেলের নিরবচ্ছিন্ন ও নিরাপদ সরবরাহ নিশ্চিত করতে বেসরকারি খাতকে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে ‘বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানিপূর্বক সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণন নীতিমালা, ২০২৬’-এর একটি খসড়া প্রস্তুত করা হচ্ছে। বর্তমানে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় খসড়াটি যাচাই-বাছাই করছে।

সরকারের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা পূরণে শুধু সরকারি ব্যবস্থার ওপর নির্ভর না করে বেসরকারি বিনিয়োগ ও অবকাঠামোকে কাজে লাগানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে একটি স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যও রয়েছে সরকারের।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান একই বাজারে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে জ্বালানি তেল বিক্রি করে। ভারতের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, দেশটিতে ইন্ডিয়ান অয়েল ও রিলায়েন্সের মতো প্রতিষ্ঠান পাশাপাশি ব্যবসা করছে। ফলে ভোক্তাদের সামনে একাধিক প্রতিষ্ঠানের পণ্য বেছে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশে অবশ্য জ্বালানি তেলের দাম সরকার ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) নির্ধারণ করে। ফলে বর্তমানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দামের ভিত্তিতে প্রতিযোগিতার সুযোগ সীমিত। সরকারের পরিকল্পনা হলো, নীতিমালার আওতায় যোগ্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে তেল আমদানির সুযোগ দেওয়া।

মন্ত্রী জানান, নীতিমালাটি এখনো যাচাই-বাছাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে। খসড়া চূড়ান্ত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক কমিটি ও পারচেজ কমিটির অনুমোদনসহ সরকারের নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে। পরে মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পাওয়ার পর নীতিমালাটি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে। এর আগে এ নিয়ে অনুমাননির্ভর আলোচনা না করারও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

জ্বালানি বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার, সরবরাহব্যবস্থা নিরবচ্ছিন্ন রাখা, বাজারে স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা বাড়ানো এবং জরুরি বা সংকটকালীন পরিস্থিতি মোকাবেলায় বেসরকারি খাতের অবকাঠামো ও বিনিয়োগ কাজে লাগানোই এই নীতিমালার মূল উদ্দেশ্য। চূড়ান্ত নীতিমালা তৈরির আগে জ্বালানি খাতের বিভিন্ন অংশীজনের মতামত ও পরামর্শ নেওয়া হবে।

বর্তমানে দেশের জ্বালানি তেলের আমদানি ও বিপণন কার্যক্রম মূলত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বিপিসির নিয়ন্ত্রণে। দেশের বাড়তে থাকা তেলের চাহিদা, শিল্প-কারখানার জ্বালানি প্রয়োজন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের চাহিদা বিবেচনায় সরকার মনে করছে, শুধু বিপিসির ওপর নির্ভর করে ভবিষ্যতের চাহিদা পূরণ করা কঠিন হতে পারে। সাম্প্রতিক বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক যুদ্ধ পরিস্থিতিও সরবরাহব্যবস্থার ঝুঁকি আরও স্পষ্ট করেছে।

বিপিসির দক্ষতা ও ব্যবস্থাপনা নিয়েও বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি ব্যবস্থার পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করা হলে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং এর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি খাতে দক্ষতা ও সেবার মান উন্নত হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, দেশের একমাত্র বড় জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি দীর্ঘদিনের পুরনো। এর সক্ষমতা বাড়ানোর কার্যকর উদ্যোগও দীর্ঘ সময় ধরে প্রত্যাশিত মাত্রায় এগোয়নি। ফলে দেশের মোট চাহিদার ৭৫ শতাংশের বেশি পরিশোধিত জ্বালানি তেল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হচ্ছে। এতে আমদানিনির্ভরতা যেমন বাড়ছে, তেমনি বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও চাপ তৈরি হচ্ছে।

অন্যদিকে ভারত তুলনামূলক কম দামে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে তা দেশীয় রিফাইনারিতে পরিশোধনের মাধ্যমে নিজেদের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি পরিশোধিত তেল রপ্তানিও করছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বড় বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা আধুনিক রিফাইনারি স্থাপনে এগিয়ে এলে তা জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। এ ধরনের বিনিয়োগে সরকার জমি, অবকাঠামো ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সহায়তা দিতে পারে। প্রয়োজনে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ বা পিপিপি মডেলও বিবেচনা করা যেতে পারে।

তবে বেসরকারি খাতকে তেল আমদানির সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর যোগ্যতা ও নিরাপত্তা শর্ত থাকা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কোনো প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দেওয়ার আগে তাদের নিজস্ব জেটি বা জাহাজের সুবিধা, তেল খালাস ও সংরক্ষণের অবকাঠামো, বিতরণ নেটওয়ার্ক এবং পর্যাপ্ত আর্থিক সক্ষমতা রয়েছে কি না—এসব বিষয় যাচাই করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সরবরাহের নিরাপত্তা, মজুদ সক্ষমতা ও বাজারে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব দিতে হবে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিমের মতে, তেল আমদানি ও বিপণন খাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা। বেসরকারি খাতে আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও সেটি উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক বাজার কাঠামোর মধ্যে করতে হবে। একই সঙ্গে আমদানিকারকদের জন্য নির্দিষ্ট যোগ্যতা ও শর্ত নির্ধারণ করা প্রয়োজন। ভারতের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সেখানে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও জ্বালানি তেল বিক্রি করছে এবং এ জন্য নির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে।

অর্থনীতিবিদ আবু আহমেদের মতে, দেশের অর্থনীতি যখন ক্রমাগত সম্প্রসারিত হচ্ছে, তখন পুরনো ও একচেটিয়া কাঠামোর ওপর নির্ভর করে থাকার সুযোগ নেই। জ্বালানি খাতেও সরকারি একক নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারি এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। তাঁর মতে, দক্ষ অর্থনীতি গড়ে তুলতে বিনিয়োগ দরকার; আর বিনিয়োগ বাড়াতে হলে বেসরকারি খাতকে সুযোগ দিতে হবে। তবে সেই বিনিয়োগ যেন নিরাপদ, স্বচ্ছ ও জনস্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তা নিশ্চিত করতে সরকারের ভূমিকা হতে হবে শক্তিশালী নিয়ন্ত্রকের।

সব মিলিয়ে, বেসরকারি খাতে জ্বালানি তেল আমদানির সুযোগ দেশের সরবরাহব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। তবে এর সুফল পেতে হলে শুধু আমদানির অনুমতি দেওয়াই যথেষ্ট নয়; বরং কঠোর মানদণ্ড, স্বচ্ছ লাইসেন্সিং ব্যবস্থা, কার্যকর নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত মজুদ সক্ষমতা এবং প্রকৃত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে দেশীয় পরিশোধন সক্ষমতা বাড়াতে বড় বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করা সম্ভব হতে পারে।

সর্বশেষ হালনাগাদ 8 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version