অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
বাংলাদেশের অর্থনীতি আগামী কয়েক বছরে এক গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় আর্থিক ব্যবস্থাপনার ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে, সীমিত রাজস্ব কাঠামো এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে এই চাপ সামাল দেওয়া সরকারের জন্য একটি বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছর থেকে শুরু করে ২০৩০ অর্থবছর পর্যন্ত বাংলাদেশকে প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করতে হবে। এই পরিমাণটি দেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসের তুলনায় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, স্বাধীনতার পর গত ৫৪ বছরে বাংলাদেশ মোট প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার ঋণ পরিশোধ করেছে—অর্থাৎ, সেই মোট অঙ্কের বড় একটি অংশ মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যেই পরিশোধের চাপ তৈরি হয়েছে।
এ পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে দেশের দুর্বল রাজস্ব কাঠামোর কারণে। বর্তমানে কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে, যা সমমানের অনেক দেশের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। ফলে সরকারের ব্যয় বাড়ানো বা অর্থনৈতিক ধাক্কা মোকাবিলা করার সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ছে।
অন্যদিকে, বৈশ্বিক নানা সংকট—যেমন কোভিড-১৯ মহামারি, ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা—দেশের রপ্তানি, প্রবাসী আয় ও রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এসব কারণে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ আরও তীব্র হয়ে উঠছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৩০ জুন ২০২৫ পর্যন্ত বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৭.২৮ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ঋণ পরিশোধের বার্ষিক পরিমাণও ক্রমাগত বাড়ছে—গত অর্থবছরে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করা হলেও, তা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৯-৩০ অর্থবছরে প্রায় ৫.৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
এই ঋণচাপের পেছনে বড় কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন মেগা প্রকল্পে বৈদেশিক ঋণের ব্যবহার। যেমন—রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পদ্মা রেল সংযোগ, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেলসহ বেশ কয়েকটি বড় অবকাঠামো প্রকল্প। এসব প্রকল্পের অনেকগুলোর গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ায় এখন মূল ঋণ পরিশোধ শুরু হয়েছে, যা সামগ্রিক চাপ বাড়াচ্ছে।
তবে সমস্যা শুধু ঋণের পরিমাণে নয়, বরং প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বও একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। অনেক প্রকল্প সময়মতো সম্পন্ন না হওয়ায় প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল আসতে দেরি হচ্ছে। আবার কিছু প্রকল্প সম্পন্ন হলেও সেগুলো পুরোপুরি চালু না হওয়ায় বিনিয়োগের পূর্ণ সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না।
ইআরডি’র বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ থেকে ২০২৯-৩০ অর্থবছরের মধ্যে মোট প্রায় ২৫.৯৯ বিলিয়ন ডলার ঋণ পরিশোধ করতে হবে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ আসল এবং বাকিটা সুদ। এই সময়ের মধ্যে ২০২৯-৩০ অর্থবছরকে সর্বোচ্চ চাপের বছর হিসেবে ধরা হয়েছে।
তবে একটি ইতিবাচক দিকও রয়েছে। বর্তমান প্রবাসী আয়ের ধারা অব্যাহত থাকলে, সর্বোচ্চ চাপের বছরেও কয়েক মাসের রেমিট্যান্স দিয়েই ঋণ পরিশোধ সম্ভব হতে পারে। কিন্তু এর জন্য প্রবাসী আয়ের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দীর্ঘমেয়াদে দেখা যায়, বর্তমান ঋণ পুরোপুরি পরিশোধ করতে বাংলাদেশের প্রায় ৩৭ বছর সময় লাগতে পারে, যদি নতুন করে কোনো ঋণ নেওয়া না হয়। কিন্তু বাস্তবে উন্নয়ন কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হলে নতুন ঋণ গ্রহণ প্রায় অনিবার্য, ফলে এই চাপ দীর্ঘদিন অব্যাহত থাকবে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে রপ্তানি বহুমুখীকরণ, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গঠন এবং রাজস্ব আহরণ বাড়ানো—এই চারটি খাতে দ্রুত উন্নতি করা প্রয়োজন।
এছাড়া, প্রবাসী আয় বাড়াতে দক্ষ শ্রমশক্তি তৈরি এবং বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানো সহজ করা জরুরি। একই সঙ্গে কর ব্যবস্থার সংস্কার, কর ফাঁকি রোধ এবং করের আওতা বাড়ানোর মাধ্যমে রাজস্ব ভিত্তি শক্তিশালী করতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়, তবে এটি একটি সতর্কবার্তা। সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষ বাস্তবায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণ করতে না পারলে ভবিষ্যতে এই চাপ বড় ধরনের অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে। ●
অকা/প্র/ই/সকাল/১৩ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 11 hours আগে

