অর্থকাগজ প্রতিবেদন 

যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে বৈশ্বিক অস্থিরতা যখন আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করছে, তখনও বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজার তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল অবস্থানে রয়েছে। সাম্প্রতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, টাকার বিনিময় হারের ওপর বর্তমানে কোনো তাৎক্ষণিক অবমূল্যায়নের চাপ নেই এবং বাজারে স্বাভাবিক ভারসাম্য বজায় রয়েছে।

মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) রাতে প্রকাশিত এক বার্তায় বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে একটি সুস্থ ভারসাম্য বিদ্যমান। ফলে বিনিময় হার স্থিতিশীল রয়েছে এবং অযাচিত চাপের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ৬ এপ্রিল ব্যাংকিং খাতে বৈদেশিক মুদ্রার মোট তারল্য প্রায় ৩.৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা মাত্র এক মাস আগে ২৬ ফেব্রুয়ারিতে ছিল ২.৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, খুব স্বল্প সময়ে প্রায় ১.৬ বিলিয়ন ডলারের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটেছে। একই সময়ে ব্যাংকগুলোর নগদ বৈদেশিক মুদ্রার পরিমাণও সামান্য বৃদ্ধি পেয়ে ৪৭.৬ মিলিয়ন ডলার থেকে ৪৯ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে।

এই পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার মজুত ব্যাংকগুলোর দৈনন্দিন আমদানি ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক লেনদেন নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে সহায়তা করছে। বর্তমানে দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ৩৪.৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি শক্তিশালী নিরাপত্তা বলয় হিসেবে কাজ করছে।

সাধারণত ব্যাংকগুলোর নেট ওপেন পজিশন একটি নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ডলার ক্রয়ের মাধ্যমে ভারসাম্য রক্ষা করে। তবে বর্তমানে এই পজিশন প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি থাকলেও গত এক মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে কোনো ডলার কেনেনি। এতে বোঝা যায়, বাজারে স্বাভাবিকভাবেই পর্যাপ্ত তারল্য রয়েছে এবং কৃত্রিম হস্তক্ষেপের প্রয়োজন পড়ছে না।

রেমিট্যান্স প্রবাহ এই স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। গত মার্চ মাসে দেশে রেকর্ড ৩.৭৭৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা পূর্ববর্তী সব মাসের তুলনায় বেশি। এছাড়া এপ্রিল মাসের প্রথম ছয় দিনেই ৬৬০ মিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০.৫ শতাংশ বেশি। এই ধারাবাহিক প্রবাহ বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়িয়ে বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

অন্যদিকে, আমদানি ব্যয় এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধও স্বাভাবিক গতিতে চলমান রয়েছে। গত মাসে প্রায় ১.৩৭ বিলিয়ন ডলারের আকু বিল পরিশোধ করা হয়েছে এবং সম্প্রতি প্রায় ১৮০ মিলিয়ন ডলারের সরকারি বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ সম্পন্ন হয়েছে। এসব পরিশোধের পরও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল অবস্থানে রয়েছে, যা অর্থনীতির দৃঢ় ভিত্তির ইঙ্গিত দেয়।

সার্বিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে বর্তমানে একটি সুসংগঠিত ভারসাম্য বিরাজ করছে। শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ, পর্যাপ্ত তারল্য এবং সুশৃঙ্খল বাজার ব্যবস্থাপনার ফলে টাকার মানের ওপর কোনো তাৎক্ষণিক অবমূল্যায়নের চাপ তৈরি হয়নি।

তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিছু সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ডলারের সম্ভাব্য অবমূল্যায়ন সংক্রান্ত নেতিবাচক ধারণাকে ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেছে। তাদের মতে, বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় এমন আশঙ্কা অযৌক্তিক এবং বাজারে অপ্রয়োজনীয় উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, বৈশ্বিক অস্থিরতার মাঝেও বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজার বর্তমানে স্থিতিশীল রয়েছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে।

অকা/ব্যাংখা/ই/সকাল/৮ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 7 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version