অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
দেশের অর্থনীতিকে টেকসই ভিত্তিতে গড়ে তুলতে হলে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য ব্যাংক-নির্ভরতা কমিয়ে মূলধন বাজার—বিশেষ করে শেয়ার বাজারের ভূমিকা জোরদার করা এখন সময়ের দাবি। উন্নত ও উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর মতো বাংলাদেশকেও ভারসাম্যপূর্ণ আর্থিক কাঠামোর দিকে অগ্রসর হতে হবে, যেখানে ব্যাংক ঋণের পাশাপাশি শেয়ার বাজারের মাধ্যমে উৎপাদনমুখী খাতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থের জোগান নিশ্চিত করা যাবে।
গত বুধবার (৫ নভেম্বর) দ্য ডেইলি স্টার ও আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেড আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে ব্রোকার, ব্যাংকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতিনিধি এবং অর্থনীতিবিদরা এই বাস্তবতা তুলে ধরেন। আলোচকরা বলেন, উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংক ঋণের তুলনায় শেয়ার বাজার এখনো কঠিন, জটিল ও সময়সাপেক্ষ বিকল্প হিসেবে রয়ে গেছে। অথচ টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হলে উৎপাদন ও অবকাঠামো খাতে দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সরবরাহের প্রধান উৎস হতে হবে পুঁজিবাজার।
বিশেষজ্ঞরা মত দেন—নতুন বিনিয়োগকারী আকৃষ্ট করা এবং কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্তিতে উৎসাহিত করতে হলে নীতিগত ধারাবাহিকতা, প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) প্রক্রিয়ার সরলীকরণ এবং বাজারে স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে আইপিও প্রক্রিয়া জটিল ও দীর্ঘ হওয়ায় উদ্যোক্তারা ব্যাংক ঋণকেই অধিকতর আকর্ষণীয় মনে করেন।
বিএপিএলসি’র প্রেসিডেন্ট রূপালী চৌধুরী বলেন, “শেয়ার বাজারে তহবিল সংগ্রহ করতে যেখানে দীর্ঘ সময় লাগে, সেখানে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া অনেক সহজ। এই কাঠামোগত বৈষম্য দূর না করলে পুঁজিবাজার উদ্যোক্তাদের কাছে আকর্ষণ হারাবে।” তিনি আরও যোগ করেন, নীতিগত অস্থিরতা বিনিয়োগকারীর আস্থা নষ্ট করছে এবং বাজারে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডিবিএ)-এর সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, “নীতিগত অস্থিরতা শেয়ার বাজারের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। এটি শুধু বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিগ্রস্ত করে না, বরং বাজারের গভীরতাকেও সীমিত করে।” তিনি প্রস্তাব দেন, বড় অংকের অর্থায়নের ক্ষেত্রে ব্যাংক ঋণের পাশাপাশি শেয়ার বাজার ব্যবহারকে উৎসাহিত করতে একটি সুস্পষ্ট ঋণ-ইক্যুইটি অনুপাত নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
ডিবিএ’র সাবেক প্রেসিডেন্ট আহমেদ রশিদ লালী প্রশ্ন তোলেন, “যদি কোনো উদ্যোক্তা দেখেন যে শেয়ার বাজার থেকে তহবিল তুলতে দুই বছর লেগে যায়, তবে তিনি কেন এখানে আসবেন?” তিনি ডিএসই কর্তৃপক্ষের আইপিও পর্যালোচনার সময়সীমা ৪৫-৬০ দিন থেকে কমিয়ে মাত্র সাত দিনে আনার প্রস্তাব দেন, যাতে উদ্যোক্তারা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
অন্যদিকে, ডিএসই চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম বলেন, “অনেক আবেদনকারী কোম্পানির আর্থিক নথিতে স্বচ্ছতার ঘাটতি থাকে, ফলে যাচাই-বাছাই করতে সময় লাগে।” তবে তিনি স্বীকার করেন, “যদি প্রকাশিত তথ্যের ওপর নির্ভর করে অনুমোদন দেওয়া যায়, তাহলে পাঁচ থেকে সাত দিনের মধ্যেই আইপিও অনুমোদন সম্ভব।” তিনি আরও জানান, সরকার এখন ব্যাংক-নির্ভর অর্থনীতি থেকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ আর্থিক ব্যবস্থায় রূপান্তরের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করছে এবং আইপিও অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুত করার জন্য পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, “বাংলাদেশের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংক-নির্ভর, যার ফলে কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে।” তিনি তথ্য তুলে ধরেন—উন্নত দেশগুলোতে জিডিপির তুলনায় বাজার মূলধনের অনুপাত যেখানে ১০০ শতাংশের বেশি, উদীয়মান অর্থনীতিতে ৫০–৭০ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশে তা মাত্র ৭ শতাংশ। এই দুর্বল বাজার মূলধন অনুপাতের ফলে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ, সম্পদ-দায়ের অসমতা এবং তারল্য সংকট বেড়েছে।
বিএসইসি কমিশনার মো. সাইফুদ্দিন বলেন, “শেয়ার বাজার শুধু ইক্যুইটি নয়; এখানে ঝুঁকি-মুক্ত সিকিউরিটিজ, করপোরেট বন্ড, সুকুক, মিউচুয়াল ফান্ডের মতো বিকল্প উপকরণ দরকার।” তিনি স্বীকার করেন, বাজারে এখনো ‘লোভ’ ও কারসাজি প্রাধান্য পাচ্ছে, যা বিনিয়োগকারীর আস্থা ক্ষুণ্ন করছে।
আলোচকদের অভিমত—যদি নীতিগত স্থিতিশীলতা, স্বচ্ছতা এবং প্রক্রিয়াগত সংস্কার একসাথে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে বাংলাদেশ শেয়ার বাজারকে দীর্ঘমেয়াদি মূলধনের প্রধান উৎসে পরিণত করতে পারবে। এতে শুধু উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়নের নতুন দিগন্ত খুলবে না, বরং দেশের অর্থনীতি ব্যাংক নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও টেকসই আর্থিক ব্যবস্থার পথে এগিয়ে যাবে। ●
অকা/পুঁবা/ই/সকাল/৬নভেম্বর, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 4 months আগে

