অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমন্বিত হামলার জবাবে ইরান পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আক্রমণ চালানোর পর পরিস্থিতি দ্রুত অস্থির হয়ে ওঠে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত যদি পূর্ণমাত্রার আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেয়, তাহলে তার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না—বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি, বিশেষত জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করবে। এই সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি।
বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সংকীর্ণ সমুদ্রপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। পারস্য উপসাগরকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা এই রুটে সামান্য বিঘ্নও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাকে নড়বড়ে করে দিতে পারে। যুদ্ধঝুঁকি বৃদ্ধি পাওয়ায় ইতোমধ্যে শিপিং কোম্পানি ও বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। এতে সরবরাহ বিলম্ব, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে এর প্রভাবও দৃশ্যমান। সাম্প্রতিক সময়ে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে যেখানে ব্যারেলপ্রতি দাম ছিল ৬১ ডলার, তা কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে বেড়ে ৬৭ ডলারে পৌঁছেছে। ইরান–যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিক আলোচনার অগ্রগতি না হওয়ায় বাজারে আগে থেকেই উদ্বেগ ছিল; সাম্প্রতিক সামরিক পদক্ষেপ সেই উদ্বেগকে আরও গভীর করেছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে।
বাংলাদেশের ঝুঁকির মাত্রা
বাংলাদেশের জন্য এই পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা সরাসরি মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর, এবং প্রায় ৯০ শতাংশ প্রাথমিক জ্বালানি—অপরিশোধিত তেল, পরিশোধিত জ্বালানি ও এলএনজি—হরমুজ প্রণালির মাধ্যমেই আমদানি করা হয়। সৌদি আরব, ইরাক ও সংযুক্ত আরব আমিরাত বাংলাদেশের প্রধান জ্বালানি সরবরাহকারী; কার্যত এই সরবরাহের বিকল্প সমুদ্রপথ খুব সীমিত।
বর্তমান সংকটে বাংলাদেশের সামনে মূলত দুই ধরনের ঝুঁকি স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
প্রথমত, মূল্যঝুঁকি। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি পেলে আমদানি ব্যয় সরাসরি বেড়ে যাবে। এতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) ও এলএনজি আমদানিকারকদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি হবে। সরকার ভর্তুকি বাড়াবে, নাকি দেশীয় বাজারে জ্বালানির দাম সমন্বয় করবে—এই প্রশ্ন সামনে আসতে পারে।
দ্বিতীয়ত, সরবরাহঝুঁকি। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে কিংবা বীমা প্রিমিয়াম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে জ্বালানি পরিবহনে বিলম্ব ঘটতে পারে। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পখাতে জ্বালানি ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা অর্থনৈতিক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব
জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বাড়াবে। এতে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং জ্বালানিনির্ভর রপ্তানি পণ্যের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা কমে যেতে পারে। পাশাপাশি আমদানি বিল বৃদ্ধি পাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়বে। এর প্রভাবে মুদ্রাস্ফীতি আবারও ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেবে।
করণীয় কী?
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশকে দ্রুত কৌশলগত পদক্ষেপ নিতে হবে। বিকল্প সরবরাহ উৎস খোঁজা, দীর্ঘমেয়াদি মূল্যচুক্তি নিশ্চিত করা এবং কৌশলগত জ্বালানি মজুত বৃদ্ধি—এই বিষয়গুলো নতুন করে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি। একইসঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোও দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি কমানোর কার্যকর উপায় হতে পারে।
বর্তমান বাস্তবতায় স্পষ্ট যে, মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি উত্তেজনা কেবল আঞ্চলিক বিষয় নয়—এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। আর সেই প্রভাব থেকে বাংলাদেশও সম্পূর্ণ মুক্ত নয়।
তথ্যসূত্র: টিবিএস ●
অকা/জ্বা/ই/সকাল/১ মার্চ, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 7 hours আগে

