অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
মাত্র পাঁচ মাসের জন্য ঘোষিত ১৫ শতাংশ শুল্ক—এটি কি স্থায়ী হবে, বাতিল হবে, নাকি আবারও বাড়বে? এই মৌলিক প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর না পাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতারা নতুন অর্ডার দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার বদলে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে ব্যস্ত। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের রফতানি প্রবাহে; নতুন ক্রয়াদেশের গতি দৃশ্যমানভাবে মন্থর হয়েছে।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে সাম্প্রতিক আইনি ও নীতিগত টানাপোড়েনে। একদিকে Supreme Court of the United States পারস্পরিক শুল্ক বাতিল করেছে, অন্যদিকে Donald Trump ভিন্ন আইনি কাঠামোর আওতায় নতুন করে ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন। এই দ্বৈত বার্তা আমদানিকারকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। ফলে শুধু নতুন অর্ডারই নয়, ইতোমধ্যে উৎপাদন বা শিপমেন্ট-প্রস্তুত পণ্যের ক্ষেত্রেও পুনরায় দরকষাকষি শুরু হয়েছে।
২০ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশে শুল্ক নামার পর কয়েকজন মার্কিন ক্রেতা বিদ্যমান অর্ডারের ওপর ২ শতাংশ মূল্যছাড় দাবি করেছেন। প্রস্তুতকারকদের মতে, এ দাবি কার্যত তাদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। কারণ, উচ্চ শুল্কের সময় অর্ডার ধরে রাখতে অনেক ক্ষেত্রেই আগেই মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। এখন নতুন করে ছাড় দিলে সংকুচিত মুনাফা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
‘অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণ’ কৌশল
অন্তত আটজন শীর্ষ রফতানিকারক জানিয়েছেন, মার্কিন ক্রেতারা আপাতত “ওয়েট অ্যান্ড সি” অবস্থানে রয়েছেন। দীর্ঘমেয়াদি শুল্ক কাঠামো পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত বড় পরিসরের অর্ডার দিতে তারা অনাগ্রহী।
Sparrow Group-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম বলেন, চূড়ান্ত ট্যারিফ হার কী দাঁড়ায়—তা না জানা পর্যন্ত ক্রেতাদের পক্ষে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা সম্ভব নয়। একইভাবে Snowtex Group-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম খালেদ জানান, পাঁচ মাস পর শুল্ক কাঠামো অপরিবর্তিত থাকবে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত না হওয়ায় ক্রেতারা সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধায় আছেন। তার প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক রফতানির উল্লেখযোগ্য অংশই যুক্তরাষ্ট্রমুখী।
শিল্পমালিকদের সংগঠন Bangladesh Knitwear Manufacturers and Exporters Association-এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম পরিস্থিতিকে “অনির্দেশ্য” বলে আখ্যা দিয়েছেন। তার মতে, ক্রেতারা এখন ন্যূনতম পরিমাণ অর্ডার দিচ্ছেন। এই প্রবণতা দীর্ঘায়িত হলে পোশাক শিল্পের উৎপাদন পরিকল্পনা ও কর্মসংস্থান—উভয় ক্ষেত্রেই চাপ বাড়বে।
নীতিগত অস্থিরতা ও প্রতিযোগিতার ঝুঁকি
অর্থনীতিবিদদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নীতির ঘন ঘন পরিবর্তন বাজারে ঝুঁকির মাত্রা বাড়াচ্ছে। গবেষণা সংস্থা Centre for Policy Dialogue-এর বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, আইনি দোলাচল এবং নির্বাহী সিদ্ধান্তের দ্বন্দ্ব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। তার মতে, নির্দিষ্ট দেশ বা পণ্যের ওপর বাড়তি শুল্ক আরোপের সুযোগ থাকায় অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কাটছে না। ফলে আমদানিকারকরা প্রয়োজন ছাড়া বড় অর্ডারে যেতে চাইবেন না—এটাই স্বাভাবিক আচরণ।
একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বৃহত্তম বাজার যুক্তরাষ্ট্র, যেখানে মোট পোশাক রফতানির প্রায় ২০ শতাংশ যায়। Office of Textiles and Apparel-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রফতানি দাঁড়িয়েছে ৮.১৮ বিলিয়ন ডলার, যা দেশটির মোট বৈশ্বিক আমদানির প্রায় ১১ শতাংশ।
২০২৫ সালের এপ্রিলে প্রথমে ৩৭ শতাংশ পারস্পরিক শুল্ক আরোপ করা হলেও আলোচনার মাধ্যমে তা ২০ শতাংশে নামানো হয়। এখন যদি ১৫ শতাংশ শুল্ক সব দেশের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হয়, তাহলে বাংলাদেশের তুলনামূলক সুবিধা হ্রাস পেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন রফতানিকারকরা। পূর্বে চীন বা ভারতের তুলনায় শুল্ক কাঠামোয় ব্যবধান থাকায় কিছু অর্ডার বাংলাদেশে সরে এসেছিল। কিন্তু সমান হারে শুল্ক আরোপ হলে প্রতিযোগিতা তীব্র হবে।
ওটেক্সার পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি–নভেম্বর সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনের পোশাক রফতানি ৩৪ শতাংশ কমলেও বাংলাদেশের রফতানি বেড়েছে ১২ শতাংশ। এই প্রবণতা স্থায়ী হবে কি না, তা এখন শুল্ক কাঠামোর ওপর নির্ভর করছে।
মূল্যচাপ ও দরকষাকষি
শুল্ক কমার ঘোষণার পর কিছু মার্কিন ক্রেতা ডেলিভারি ডিউটি পেইড (ডিডিপি) মূল্যে ২ শতাংশ সমন্বয়ের অনুরোধ জানিয়েছেন। ঢাকার একটি বায়িং হাউজের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, সরবরাহকারীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ছাড় আদায় সম্ভব না হলে সেই চাপ নিজেদেরই সামলাতে হয়। যেসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ চালান যুক্তরাষ্ট্রে যায়, তাদের জন্য এ চাপ আরও তীব্র।
শিল্প সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, নতুন কর্মসপ্তাহ শুরু হলে আরও ক্রেতা একই দাবি তুলতে পারেন। প্রস্তুতকারকদের যুক্তি, শুল্ক ৫ শতাংশ পয়েন্ট কমলেও তার পুরো সুবিধা একতরফাভাবে খুচরা বিক্রেতারা নিতে পারেন না। উচ্চ শুল্কের সময় অর্ডার টিকিয়ে রাখতে প্রস্তুতকারকেরাও মূল্য সমন্বয় করেছে—সুতরাং সাশ্রয়ের অংশীদার হওয়া তাদের ন্যায্য দাবি।
সব মিলিয়ে, ওয়াশিংটনের নীতিগত অনিশ্চয়তা ও মূল্যচাপের দ্বিমুখী সংকটে রয়েছে বাংলাদেশের পোশাক খাত। চূড়ান্ত শুল্ক কাঠামো স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত বড় ধরনের পুনরুদ্ধার দেখা কঠিন—এমনটাই মনে করছেন শিল্পসংশ্লিষ্টরা। ●
অকা/তৈপোশি/ই/সকাল/২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 6 hours আগে

