শিপন হালদার> 

বাংলাদেশের অর্থনীতির অনেক গল্প আছে। পোশাকশিল্পের গল্প আছে, কৃষির গল্প আছে, উদ্যোক্তাদের গল্প আছে। কিন্তু আরেকটি গল্প আছে, যা অনেক সময় পরিসংখ্যানের আড়ালে চাপা পড়ে যায়। সেটি হলো প্রবাসী শ্রমিকদের গল্প।

গ্রামের কোনো তরুণ, যিনি কয়েক বিঘা জমি বিক্রি করে বিদেশে গেছেন; পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি, যিনি হাজার মাইল দূরে থেকেও দেশে টাকা পাঠিয়ে সংসার চালাচ্ছেন; কিংবা সেই মা, যিনি প্রতি মাসে ছেলের পাঠানো রেমিট্যান্সের অপেক্ষায় থাকেন—বাংলাদেশের অর্থনীতির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক গভীর।

এই বাস্তবতায় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র নয়; এটি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, দারিদ্র্য হ্রাস এবং সামাজিক উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি।

সেই কারণেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া সফরকে শুধু একটি কূটনৈতিক সফর হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এই সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা সম্ভবত এসেছে শ্রমবাজারকে ঘিরেই। যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তিনি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের কাছে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য শ্রমবাজার দ্রুত উন্মুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে অনিয়মিত কর্মীদের বৈধতা এবং আটক শ্রমিকদের পুনর্বহালের বিষয়ও তুলে ধরেছেন।

প্রশ্ন হচ্ছে, মালয়েশিয়ার দরজা কি আবার খুলছে?

যদি সত্যিই তা হয়, তাহলে এর অর্থনৈতিক প্রভাব হবে বহুমাত্রিক।

বর্তমানে মালয়েশিয়ায় ৮ লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মরত আছেন। মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে এটি বাংলাদেশের অন্যতম বড় শ্রমবাজার। কয়েক বছর ধরে ভিসা জটিলতা, নিয়োগে অনিয়ম, সিন্ডিকেট এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণে নতুন কর্মী পাঠানোর গতি কমে যায়। এর প্রভাব পড়ে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ, কর্মসংস্থান এবং অভিবাসন খাতে।

বাংলাদেশে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি তাদের সবার জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারছে না। ফলে বিদেশি শ্রমবাজারের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।

মালয়েশিয়ার অর্থনীতিও এখন নতুন কর্মীর প্রয়োজন অনুভব করছে। উৎপাদন, নির্মাণ, কৃষি, সেবা এবং প্ল্যান্টেশন খাতে শ্রমিক সংকট নিয়ে দেশটির ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। ফলে বাংলাদেশের জন্য এটি একটি বাস্তব সুযোগ।

তবে শুধু শ্রমবাজার খুললেই হবে না। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে।

বাংলাদেশি কর্মীদের বিদেশে যেতে গিয়ে অস্বাভাবিক খরচ বহন করতে হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে একজন শ্রমিককে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে হয়েছে। কেউ কেউ ঋণগ্রস্ত হয়েছেন, কেউ জমি বিক্রি করেছেন। ফলে বিদেশে গিয়ে প্রথম কয়েক বছর কেবল ঋণ পরিশোধ করতেই কেটে গেছে।

যদি নতুন করে শ্রমবাজার চালু হয়, তাহলে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক এবং কম ব্যয়বহুল করতে হবে। অভিবাসন যেন ব্যবসা না হয়ে ওঠে, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি।

আমি মনে করি, এবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত ‘স্মার্ট মাইগ্রেশন’। শুধু শ্রমিক পাঠানো নয়, দক্ষ কর্মী পাঠানো। প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, ইলেকট্রিক্যাল, মেকানিক্যাল ও আধুনিক শিল্পখাতে প্রশিক্ষিত জনশক্তি তৈরি করতে পারলে বাংলাদেশ আরও বেশি আয় করতে পারবে।

প্রবাসী আয়ের গুরুত্বও নতুন করে উপলব্ধি করা প্রয়োজন। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়ে রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা, গ্রামীণ অর্থনীতিতে চাহিদা সৃষ্টি করা এবং দারিদ্র্য কমাতে এর অবদান অনস্বীকার্য।

তাই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় পুরোপুরি চালু হওয়ার সম্ভাবনাকে কেবল শ্রম অভিবাসনের খবর হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি বাংলাদেশের জন্য নতুন কর্মসংস্থান, নতুন রেমিট্যান্স এবং নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর সেই সম্ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা তৈরি করেছে। এখন দেখার বিষয়, আলোচনার টেবিলের আশাবাদ কত দ্রুত বাস্তব ফলাফলে রূপ নেয়।

কারণ মালয়েশিয়ার দরজা খুললে শুধু কয়েক হাজার কর্মীর ভাগ্যই বদলাবে না; বদলাতে পারে বাংলাদেশের অর্থনীতিও। 

 

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।

 

সর্বশেষ হালনাগাদ 15 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version