বিনোদন প্রতিবেদক

​হুট করে একটা গান ভাইরাল হলো। ফেসবুকের রিল থেকে শুরু করে চায়ের কাপের আড্ডায়—সবাই সেটাই শুনছে। টপ চার্টের শীর্ষে পৌঁছে গেল গানটি। কিন্তু কিছুদিন পর জানা গেল, গানটির পেছনে কোনো মানুষের রক্ত-ঘাম নেই; বরং এর বেশির ভাগ অংশই তৈরি করেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI)। তখন কি মানুষের তৈরি গানের সঙ্গে এই এআই-সৃষ্ট গানকে একই আসনে বসানো যায়? এই প্রশ্নটি এখন আর কল্পবিজ্ঞান নয়, বরং বিশ্ব সঙ্গীতের বাজারে অন্যতম আলোচিত ও বাস্তব এক বিতর্ক।
​অস্ট্রেলিয়ার রেকর্ডিং শিল্পের প্রধান সংগঠন অস্ট্রেলিয়ান রেকর্ডিং ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন (এআরআইএ) এ বিষয়ে নতুন ও কঠোর নিয়ম চালু করেছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, পুরোপুরি বা বেশির ভাগ অংশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি কোনো গান আর দেশটির অফিশিয়াল মিউজিক চার্টে জায়গা পাবে না। গানগুলোকে অবশ্যই ‘সাবস্ট্যানশিয়ালি হিউম্যান-মেইড’ বা মূলত মানুষের তৈরি হতে হবে।
​অবশ্য এর মানে এই নয় যে গানে এআই ব্যবহার করলেই তা সরাসরি বাতিল হয়ে যাবে। এআরআইএ জানিয়েছে, গান তৈরিতে এআই একটি সহায়ক টুল হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে শর্ত হলো—
​গানটির মূল সুর ও কথা মানুষের লেখা হতে হবে।
​মূল ভোকাল ও প্রধান বাদ্যযন্ত্রগুলো মানুষকেই পারফর্ম করতে হবে।
​মাস্টারিং বা ড্রাম মেশিন ও স্বয়ংক্রিয় টিউনিংয়ের মতো কিছু প্রযুক্তিগত সহায়তা নেওয়া যাবে।
​পাশাপাশি স্ট্রিম বা চার্টে ওঠার জন্য কোনো ধরনের কারসাজি বা জালিয়াতি করা যাবে না।
​কোনো গান এই নিয়ম না মানলে এআরআইএ সেটিকে চার্ট থেকে সরিয়ে দেওয়া, পেছনের তারিখে চার্টের অবস্থান পরিবর্তন করা এবং কোনো পুরস্কার দেওয়া হয়ে থাকলে তা ফিরিয়ে নেওয়ার মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। তবে শিল্পী বা তাঁদের প্রতিনিধিরা এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ পাবেন।
​এই নিয়মের পেছনে রয়েছে অস্ট্রেলিয়ার সাম্প্রতিক একটি আলোচিত ঘটনা। দেশটির পরিচিত শিল্পী ও ডিজে জশ ফাওয়াজ ম্যাডোনার বিখ্যাত গান ‘লাইক আ প্রেয়ার’-এর একটি নতুন কাভার ভার্সন করেন। গানটি প্রকাশের পর থেকেই অস্ট্রেলিয়ার রেডিওতে সবচেয়ে বেশি বাজানো গানে পরিণত হয় এবং স্পটিফাইতেই কোটি কোটিবার স্ট্রিম হয়। গত জুলাই মাসে এটি এআরআইএর দুটি চার্টের শীর্ষের কাছাকাছি চলে আসে।
​প্রথমে ফাওয়াজ দাবি করেছিলেন যে তিনি এআইকে কেবল একটি ‘টুল’ হিসেবে ব্যবহার করেছেন। কিন্তু পরবর্তীতে তীব্র সমালোচনার মুখে পরিষ্কার হয় যে, গানটির মূল ভোকাল এবং ড্রামের একটি বড় অংশই এআই দিয়ে তৈরি। এই ঘটনার পরই প্রশ্ন ওঠে—যেখানে নিখাদ মানবীয় শৈল্পিকতা বা পরিশ্রম ছাড়াই শুধু একটি প্রম্পটের মাধ্যমে গান বানিয়ে ফেলা হচ্ছে, সেটিকে কেন মানুষের তৈরি শিল্পকর্মের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার সুযোগ দেওয়া হবে?
​অস্ট্রেলিয়ার পাশাপাশি ইউরোপের দেশ সুইডেনও একই ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। এ বছরের শুরুর দিকে দেশটি অফিশিয়াল চার্ট থেকে ‘আই নো, ইউ আর নট মাইন’ (Jag vet, du är inte min) নামের একটি ফোক-পপ ব্যালড গান পুরোপুরি বাদ দেয়। গানটি স্পটিফাইসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে লাখ লাখ মানুষের মন জয় করে দারুণ সাড়া ফেললেও, এটি এআই দিয়ে তৈরি প্রমাণিত হওয়ায় চার্ট থেকে নিষিদ্ধ করা হয়।
​প্রযুক্তিবিদ ও কিছু প্রযোজক এআইকে সঙ্গীতের আধুনিক টুল হিসেবে দেখলেও, মূলধারার শিল্পীরা এর নৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে শঙ্কিত। এআই চালিত বট বা জেনারেটর ব্যবহার করে যেখানে মুহূর্তের মধ্যে শত শত গান বাজারে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে, তাতে প্রকৃত গীতিকার, সুরকার ও গায়কদের মেধা ও জীবিকা হুমকির মুখে পড়ছে।

​বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই প্রযুক্তিকে পুরোপুরি ঠেকানো অসম্ভব। তবে অস্ট্রেলিয়া ও সুইডেনের মতো দেশগুলোর এই কঠোর নীতিমালার ফলে ভবিষ্যতে জনপ্রিয় সঙ্গীত জগতে 'মানুষের তৈরি শিল্প' বনাম 'এআই শিল্প'-এর এই লড়াই আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

সর্বশেষ হালনাগাদ 3 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version