অর্থকাগজ প্রতিবেদন 

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ, যা দেশটির রফতানি খাত—বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য উল্লেখযোগ্য স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে। এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত পাল্টা শুল্ক বা রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ কমে ১৯ শতাংশে নেমে এসেছে, যা আগে ছিল ২০ শতাংশ এবং তারও আগে ৩৭ শতাংশ।

চুক্তির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো—যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত তুলা ও কৃত্রিম তন্তু ব্যবহার করে বাংলাদেশে তৈরি পোশাক যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শূন্য শুল্ক সুবিধায় প্রবেশের সুযোগ পাবে। এতে করে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের কাঁচামাল সরবরাহ, উৎপাদন ব্যয় ও রফতানি প্রতিযোগিতায় নতুন মাত্রা যুক্ত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, বাংলাদেশ সময় রাত ১০টার দিকে ওয়াশিংটনে নিজ নিজ দেশের পক্ষে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তরের (ইউএসটিআর) প্রধান জেমিসন গ্রিয়ার। এই চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে গত বছরের এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া প্রায় নয় মাসের আলোচনা প্রক্রিয়ার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে।

চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ থেকে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত ছিলেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী এবং বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন। আলোচনার সার্বিক দিকনির্দেশনা ও কৌশলগত নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য জেমিসন গ্রিয়ার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ভূয়সী প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের ‘অসাধারণ প্রচেষ্টা’র কথা উল্লেখ করে বলেন, এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নীতির সঙ্গে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ করবে।

চুক্তি সইয়ের পর বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, এই সমঝোতার মাধ্যমে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সম্পর্ক একটি নতুন ও ঐতিহাসিক স্তরে উন্নীত হলো। তাঁর ভাষায়, এর ফলে দুই দেশ একে অপরের বাজারে আগের চেয়ে বেশি ও কার্যকর প্রবেশাধিকার পাবে, যা দীর্ঘমেয়াদে উভয় অর্থনীতির জন্যই ইতিবাচক হবে।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কহার একসময় ৩৭ শতাংশে পৌঁছেছিল। পরে গত বছরের আগস্টে তা কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়। সর্বশেষ এই চুক্তির মাধ্যমে শুল্কহার আরও এক শতাংশ কমে ১৯ শতাংশে দাঁড়াল। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান বলেন, এই এক শতাংশ হ্রাসও রফতানিকারকদের জন্য বাস্তব অর্থে গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা তৈরি করবে। বিশেষ করে নির্দিষ্ট কিছু বস্ত্র ও পোশাকপণ্যে শূন্য শুল্ক সুবিধা বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে নতুন গতি সঞ্চার করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। বাংলাদেশের পক্ষে তিনিই ছিলেন এই চুক্তির প্রধান আলোচক।

চুক্তিটি ইতোমধ্যে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে অনুমোদন পেয়েছে। দুই দেশ প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন জারি করলে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হবে।

সংশোধিত শুল্ক কাঠামোর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পোশাক রফতানিকারক দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হয়েছে। যেখানে বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনামের ওপর ২০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক বহাল রয়েছে, সেখানে ভারত ১৮ শতাংশ শুল্ক সুবিধা আদায় করতে পেরেছে। অন্যদিকে পাকিস্তান, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার পণ্যের ওপরও ১৯ শতাংশ হারে শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক বাজারে রফতানিতে চীন শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। এর পরেই ভিয়েতনাম, তৃতীয় স্থানে বাংলাদেশ এবং চতুর্থ স্থানে ভারত। নতুন শুল্ক ব্যবস্থার ফলে এই অবস্থান ধরে রাখা কিংবা আরও শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

গত বছরের আগস্টে ২০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপের পরপরই শুল্কহার কমানোর লক্ষ্যে ঢাকা ও ওয়াশিংটনের মধ্যে জোরালো আলোচনা শুরু হয়। নীতিনির্ধারকদের একটি অংশ তখন আশাবাদ প্রকাশ করেছিলেন যে, শুল্কহার ১৫ শতাংশ পর্যন্ত নামিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে। তবে বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলের কোনো দেশকেই ১৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক সুবিধা দেয়নি। তাঁর মতে, সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ভারত বাণিজ্য চুক্তির প্রভাব এবং বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত ফলাফলে ভূমিকা রেখেছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিউটিও সেলের সাবেক মহাপরিচালক মো. হাফিজুর রহমান মনে করেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় দেশটি কিছুটা বাড়তি নমনীয়তা পেয়েছে। তবে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ দেখছেন না তিনি। তাঁর মতে, কম শ্রমব্যয় ও তুলনামূলক কম উৎপাদন খরচের কারণে ১৯ শতাংশ শুল্ক আরোপিত হলেও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ভারতের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ খুব একটা পিছিয়ে পড়বে না।

শুল্ক ছাড়ের পাশাপাশি এই চুক্তিতে বেশ কিছু বাণিজ্যিক ও কৌশলগত অঙ্গীকার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা ব্যবহার করে বাংলাদেশে উৎপাদিত পোশাকে শুল্কমুক্ত সুবিধা, যা দুই দেশের বস্ত্র ও পোশাক খাতের সরবরাহ চেইনকে আরও ঘনিষ্ঠ করবে। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক টানাপোড়েন কমানোর বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং থেকে ২৫টি বিমান কেনার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। এই ক্রয়ের আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা।

চুক্তিতে আরও যেসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা, গম, সয়াবিন ও এলএনজি আমদানি বাড়ানো; ই-কমার্সে শুল্ক আরোপ না করা; মেধাস্বত্ব সুরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের মানদণ্ড অনুসরণ; এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সংস্কার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবগুলোকে সমর্থন দেওয়া।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র এখনও বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রফতানি বাজার। গত অর্থবছরে দেশটিতে বাংলাদেশের মোট রফতানি ছিল ৮ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ওভেন পোশাক রফতানি হয়েছে ৪ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলার এবং নিটওয়্যার ২ দশমিক ৬০ বিলিয়ন ডলার। পাশাপাশি হোম টেক্সটাইল রফতানি দাঁড়িয়েছে ১৫০ মিলিয়ন ডলারে এবং ক্যাপ রফতানি হয়েছে ২৫৯ মিলিয়ন ডলার।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৩৪৬ মিলিয়ন ডলারের তুলা আমদানি করেছে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ২৭৮ মিলিয়ন ডলার। মোট তুলা আমদানির প্রায় ১০ শতাংশই এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে—যা নতুন চুক্তির প্রেক্ষাপটে ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অকা/বা/ই/সকাল/১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 7 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version