অর্থকাগজ প্রতিবেদন 

রাজধানীর হাতিরপুল এলাকায় বিকেলের রোদ তখনও পুরোপুরি কমেনি। ট্রাকের পাশে দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে আছেন বৃদ্ধ আব্দুল কুদ্দুস (৬৫)। দেড় ঘণ্টার বেশি সময় ধরে অপেক্ষা করছেন তিনি। সামনে তখনও প্রায় ১৫ জন মানুষ। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়েছে, হাঁটতেও কষ্ট হয়। তবু লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া তার আর কোনো উপায় নেই।

হাতিরপুলের একটি টাইলসের দোকানে কাজ করেন আব্দুল কুদ্দুস। সামান্য আয়েই সাতজনের সংসার চালাতে হয় তাকে। নিত্যপণ্যের বাড়তি দামে সংসারের হিসাব মেলানো ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। তাই রমজান উপলক্ষে স্বল্পমূল্যে পণ্য কিনতে টিসিবির ট্রাকের সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন তিনি।

কথা বলতে বলতে কাঁপছিল তার হাত। চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। তিনি বললেন, এই বয়সে কাজ করাটা সহজ নয়, কিন্তু সংসারের দায় তাকে থামতে দেয় না। বাজারের চেয়ে কম দামে চাল-ডাল-তেল পেলে অন্তত কিছু টাকা বাঁচবে, সেই সাশ্রয় দিয়েই পরিবারের জন্য একটু ভালো ইফতার জোগাড় করার আশা তার। আক্ষেপের সুরে তিনি আরও বলেন, বয়স্কদের জন্য যদি আলাদা কোনো ব্যবস্থা থাকত, তাহলে এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হতো না।

স্বল্প আয়ে টিকে থাকার লড়াই

আব্দুল কুদ্দুসের পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন মর্জিনা বেগম। ব্যক্তিগত জীবনের ঝড় পেরিয়ে এখন তিনি বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকেন। ছোট দুই ভাই-বোনের দায়িত্বও তার কাঁধে। সংসারের খরচ সামলাতে প্রতিদিনই তাকে লড়াই করতে হয়।

মর্জিনা জানান, বাবা-মা লাইনে দাঁড়াতে পারেন না, তাই কষ্ট হলেও তাকেই আসতে হয়। সব পণ্য কেনা সম্ভব হয় না, তবু এখানে যা পাওয়া যায়, সেটুকুই তাদের জন্য বড় স্বস্তি। তার চোখেমুখে ক্লান্তি থাকলেও কথায় ছিল দৃঢ়তা—পরিবারের জন্য এই অপেক্ষা তার কাছে বাধ্যতামূলক দায়িত্ব।

রাজধানীজুড়ে একই চিত্র

শুধু হাতিরপুল নয়; বারিধারা, গুদারাঘাট ও খিলক্ষেতসহ রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে একই দৃশ্য দেখা গেছে। টিসিবির ট্রাকের সামনে দীর্ঘ লাইন। অনেকেই তিন থেকে চার ঘণ্টা অপেক্ষা করেন, শুধুমাত্র ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা সাশ্রয়ের আশায়।

টিসিবির নির্ধারিত দামে একজন ক্রেতা সর্বোচ্চ দুই লিটার সয়াবিন তেল, দুই কেজি মসুর ডাল, এক কেজি চিনি, এক কেজি ছোলা ও আধা কেজি খেজুর কিনতে পারেন। সব মিলিয়ে খরচ হয় ৫৯০ টাকা। একই পরিমাণ পণ্য বাজার থেকে কিনতে প্রায় ৯৫০ টাকা লাগে। অর্থাৎ প্রায় ৩৫০ টাকা পর্যন্ত সাশ্রয় সম্ভব। নিম্ন-আয়ের মানুষের কাছে এই সাশ্রয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবে প্রতিটি ট্রাক থেকে দিনে সর্বোচ্চ ৪০০ জন পণ্য কিনতে পারেন। কিন্তু প্রতিদিন এসব পয়েন্টে আসা মানুষের সংখ্যা এর প্রায় দ্বিগুণ। ফলে অনেকেই দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর খালি হাতে ফিরে যান।

ভিড় ও ন্যায্যতার চ্যালেঞ্জ

বারিধারায় টিসিবির পণ্য কিনতে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন আকলিমা আক্তার। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত তিনি জানান, আগে কখনো টিসিবির পণ্য কেনেননি। কিন্তু বাড়তি খরচ সামাল দিতে এবার লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে। প্রায় দুই ঘণ্টা অপেক্ষার পর পণ্য পেয়েছেন তিনি। তার মতে, ভিড় কম থাকলেও অপেক্ষার সময় কমে না।

বারিধারায় পণ্য বিক্রির দায়িত্বে থাকা শাহজাহান স্টোরের মালিক জানান, প্রতিদিন সকাল থেকে বিক্রি শুরু হয় এবং বরাদ্দ শেষ হওয়া পর্যন্ত চলে। কিন্তু সীমিত বরাদ্দের কারণে অনেকেই ফিরে যান। তিনি আরও বলেন, কিছু মানুষ একাধিকবার লাইনে দাঁড়িয়ে পণ্য নেওয়ার চেষ্টা করেন, যা ন্যায্যতা নিশ্চিত করাকে কঠিন করে তোলে। তবু তারা যাচাই-বাছাই করে সুষ্ঠুভাবে বিতরণের চেষ্টা করেন।

সারাদেশে কার্যক্রম

টিসিবি সূত্রে জানা গেছে, ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই কার্যক্রম চলবে ১২ মার্চ পর্যন্ত। সারা দেশে ৪৫০টি ভ্রাম্যমাণ ট্রাকের মাধ্যমে (ছুটির দিন ছাড়া) নিম্ন-আয়ের মানুষের কাছে পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। প্রতিটি ট্রাকে ৪০০ জনের জন্য বরাদ্দ রয়েছে। রমজান উপলক্ষে প্রায় ৩৫ লাখ ভোক্তার কাছে ২৩ হাজার টন পণ্য পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

বাস্তবতার নির্মম চিত্র

এই দীর্ঘ লাইন শুধু পণ্য কেনার সারি নয়—এটি বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার এক স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য কয়েকশ টাকা সাশ্রয়ও বড় স্বস্তি। কিন্তু সেই স্বস্তি পেতে তাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।

অকা/প্র/ই/সকাল/১ মার্চ, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 7 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version