অর্থকাগজ প্রতিবেদন
দেশে ব্যাংকিং খাতে তারল্য পরিস্থিতির উন্নতি, আমদানি বিল পরিশোধের চাপ কমে যাওয়া এবং রফতানিতে স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধির ফলে রেমিট্যান্সের ডলারের বাজারে চাহিদা হ্রাস পাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে বাজারে ডলারের দাম কমে আসতে শুরু করেছে।
ব্যাংকগুলোর ট্রেজারি কর্মকর্তারা জানান, গত বৃহস্পতিবার (১৯ জুন) রেমিট্যান্সের ডলার কেনার জন্য ব্যাংকগুলো ১২২.৭০ থেকে ১২২.৮০ টাকা রেট দিয়েছে, যা মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে ছিল ১২৩.২০ থেকে ১২৩.৩০ টাকা— অর্থাৎ প্রতি ডলারে ৫০ থেকে ৭০ পয়সা কম।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১৪ মে বাজারভিত্তিক বিনিময় হার চালু করার পর অনেকেই ধারণা করেছিলেন, এতে ডলারের দর বাড়তে পারে। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টো। দেশের বড় ব্যাংকগুলোর ট্রেজারি প্রধানরা অনানুষ্ঠানিকভাবে সর্বোচ্চ ১২৩ টাকায় ডলার কেনার বিষয়ে একমত হন। ফলে ঘোষণার পরপরই ডলারের দর নিম্নমুখী হয়।
ব্যাংকাররা বলছেন, রফতানি আয়ের প্রবৃদ্ধি থাকলেও আমদানি খুব বেশি না বাড়ায় আন্তঃব্যাংক বাজারে রেমিট্যান্স ডলারের চাহিদা হ্রাস পেয়েছে। বাজারের স্বাভাবিক নিয়মে চাহিদা কমলে দামও পড়ে যায়— এখানেও সেই পরিস্থিতিই ঘটেছে। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, “বাজারভিত্তিক বিনিময় হার চালু হওয়ার পর অনেকেই দর বাড়ার আশঙ্কা করেছিলেন। কিন্তু এখন ব্যাংকগুলোর কাছে আগের মতো ডলারের চাহিদা নেই, ফলে দরও কমে আসছে।”
তিনি আরও বলেন, দেশে বিনিয়োগ স্থবির অবস্থায় রয়েছে। ফলে মূলধনী যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানি কমেছে। অন্যদিকে, ব্যাংকগুলো আগের মাসগুলোতে বেশিরভাগ বকেয়া আমদানি বিল পরিশোধ করেছে। সেই সঙ্গে ওভার-ইনভয়েসিং ও আন্ডার-ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে অর্থ পাচারও হ্রাস পেয়েছে। সব মিলিয়ে ব্যাংক খাতে তারল্য বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত দেশের রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৪৪.৯৫ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০.৩৬ শতাংশ বেশি। একই সময়ে আমদানি এলসি খোলা হয়েছে ৫৮.৯৪ বিলিয়ন ডলার, যার প্রবৃদ্ধি মাত্র ২.৯৮ শতাংশ। এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে ৫৮.৮২ বিলিয়ন ডলার, যা ৬.০৮ শতাংশ বেশি।
অন্যদিকে, একই অর্থবছরের জুলাই থেকে ২১ জুন পর্যন্ত প্রবাসী আয় এসেছে ২৯.৫ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৬.৭ শতাংশ বেশি। বিশ্লেষকরা বলছেন, ঈদ উপলক্ষে ব্যাংকগুলো ২০ দিন বন্ধ না থাকলে এই আয় আরও বাড়তে পারত।
এদিকে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বেসরকারি খাত থেকে স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণ নেওয়ার প্রবণতা কমেছে। ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত কিছুটা ঋণ নেওয়া হলেও ডলারের সামগ্রিক চাহিদা এখনও কমই রয়েছে।
কয়েকটি ব্যাংকের নীতিনির্ধারক কর্মকর্তা জানান, আগামী কয়েক মাসে ডলারের ওপর বড় কোনো চাপ আসার সম্ভাবনা নেই। অধিকাংশ বিনিয়োগকারী আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করছেন, ফলে নতুন বিনিয়োগ এবং সে-সম্পর্কিত আমদানি তেমন বাড়বে না।
তারা মনে করছেন, রফতানি ও রেমিট্যান্সের ইতিবাচক প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বাজারে ডলারের সরবরাহ আরও বাড়বে এবং বিনিময় হার আরও স্থিতিশীল হবে।
একটি বিদেশি এক্সচেঞ্জ হাউসের কান্ট্রি হেড জানান, “আগে ব্যাংকগুলো আমাদের কাছে ফোন করে ডলার চাইত। এখন আমরা ব্যাংকগুলোকে ফোন করে ডলার বিক্রি করার চেষ্টা করলেও অনেকেই ফিরিয়ে দিচ্ছে। এমনকি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোও এখন তেমন চাহিদা দেখাচ্ছে না।” তিনি আরও বলেন, প্রতিদিনই ডলারের দর ৫ থেকে ১০ সেন্ট করে কমছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের ৪ জুন পর্যন্ত দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ২০.৭৭ বিলিয়ন ডলার। টানা পাঁচ মাস ধরে রিজার্ভ ২০ বিলিয়ন ডলারের উপরে রয়েছে, যা মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
অকা/ব্যাংখা/ই/সকাল/২৩ জুন, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 8 months আগে

Leave A Reply

Exit mobile version