অর্থকাগজ প্রতিবেদন
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রত্যাশিত গতি এখনও ফিরে আসেনি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা, শিল্প উৎপাদনে দুর্বলতা, জ্বালানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতা এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার প্রভাবে সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এ সময়ে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে মাত্র ২.২২ শতাংশ, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৪.৫৩ শতাংশ।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, অর্থনীতির তিনটি প্রধান খাত—শিল্প, কৃষি ও সেবা—সবকটিতেই প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে শিল্প খাতে। স্থির মূল্যে হিসাব করলে জানুয়ারি-মার্চ সময়ে শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ০.২৮ শতাংশে নেমে এসেছে, যেখানে এক বছর আগে একই সময়ে প্রবৃদ্ধি ছিল ৩.৩৩ শতাংশ। শিল্প খাতের এই নেতিবাচক প্রবণতাই সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে উল্লেখযোগ্যভাবে নিচে নামিয়ে এনেছে।
বিশেষ করে উৎপাদনশীল বা ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের দুর্বলতা উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এ খাতে প্রবৃদ্ধি কমে ঋণাত্মক ০.৩৪ শতাংশে নেমেছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি সরবরাহ খাতেও ঋণাত্মক ৩.৫৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি রেকর্ড হয়েছে। শিল্প উৎপাদনের জন্য অপরিহার্য এসব খাতে সংকোচন উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহের সীমাবদ্ধতা এবং বিনিয়োগে অনিশ্চয়তার প্রতিফলন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রবৃদ্ধির ধীরগতি শুধু শিল্পেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশের জিডিপিতে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখা সেবা খাতেও গতি কমেছে। তৃতীয় প্রান্তিকে এ খাতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩.৫২ শতাংশ, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৭.৩২ শতাংশ। ব্যবসা-বাণিজ্যের ধীরগতি, ভোগব্যয় কমে যাওয়া এবং বিনিয়োগে স্থবিরতার প্রভাব সেবা খাতেও পড়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
কৃষি খাতেও একই চিত্র দেখা গেছে। চলতি অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১.৭৪ শতাংশ, যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ হার ছিল ৪.৬১ শতাংশ। কৃষি উৎপাদনের গতি কমে যাওয়াও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
তিন প্রান্তিকের তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অর্থবছরজুড়েই প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিক অবনমন হয়েছে। প্রথম প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি ছিল ৪.৯৬ শতাংশ, দ্বিতীয় প্রান্তিকে তা কমে ৩.০৩ শতাংশে নামে এবং তৃতীয় প্রান্তিকে আরও নেমে আসে ২.২২ শতাংশে। অর্থাৎ অর্থনীতির গতি ক্রমান্বয়ে মন্থর হয়েছে।
তবে পুরো ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য বিবিএসের প্রাথমিক হিসাব বলছে, দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪.১৪ শতাংশ হতে পারে, যা আগের অর্থবছরের ৩.৪৯ শতাংশ থেকে কিছুটা বেশি। কিন্তু তৃতীয় প্রান্তিকের দুর্বল ফলাফল বিবেচনায় নিয়ে অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করছেন, এই বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হিসাব বাস্তব অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে আরও বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে।
বর্তমান মূল্যে হিসাব করলে তৃতীয় প্রান্তিকে দেশের অর্থনীতির আকার দাঁড়িয়েছে ১৫.৩৯১ ট্রিলিয়ন টাকা, যা এক বছর আগে একই সময়ে ছিল ১৪.১৯২ ট্রিলিয়ন টাকা। খাতভিত্তিক অবদানে সেবা খাতের অংশ ৫৪.৬৩ শতাংশ, শিল্প খাতের ৩৫.৫১ শতাংশ এবং কৃষি খাতের ৯.৮৬ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদদের মতে, শিল্প খাতে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি শুধু একটি খাতের দুর্বলতা নয়; এটি সামগ্রিক অর্থনীতির চাহিদা, উৎপাদন ও বিনিয়োগের সংকেতও বহন করে। দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ সুদের হার, বেসরকারি খাতে ঋণের ধীর প্রবাহ, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা, আমদানি ব্যয়ের চাপ এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি শিল্প খাতকে চাপে রেখেছে। এর প্রভাব কর্মসংস্থান, রফতানি সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগেও পড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিকে টেকসইভাবে পুনরুদ্ধার করতে হলে শিল্প উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, বেসরকারি বিনিয়োগে আস্থা ফিরিয়ে আনা, উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং উৎপাদনমুখী খাতের জন্য কার্যকর নীতিগত সহায়তা জোরদার করা জরুরি। অন্যথায় প্রবৃদ্ধির এই মন্থর ধারা আগামী অর্থবছরেও দেশের অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকতে পারে।
সর্বশেষ হালনাগাদ 7 hours আগে

