অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
প্রথম শিল্প বিপ্লবটি হয়েছিল ১৭৮৪ সালে বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কারের মাধ্যমে। এরপর ১৮৭০ সালে বিদ্যুৎ ও ১৯৬৯ সালে ইন্টারনেটের আবিষ্কার শিল্প বিপ্লবের গতিকে বাড়িয়ে দেয় কয়েক গুণ। বর্তমানে শুরু হওয়া চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ছাড়িয়ে যেতে পারে, আগের তিনটি বিপ্লবকে। এখনও পর্যন্ত মানব জাতি চারটি শিল্প বিপ্লবের মধ্য দিয়েই চলছে। প্রথম শিল্প বিপ্লব উৎপাদনের যান্ত্রিকীকরণে পানি প্রবাহ এবং বাষ্পশক্তি ব্যবহার করে। দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লবে বৃহত্তর উৎপাদনে বৈদ্যুতিক শক্তি ব্যবহৃত হয়। তৃতীয় শিল্প বিপ্লবে উৎপাদনকে স্বয়ংক্রিয় করতে ইলেকট্রনিকস এবং তথ্যপ্রযুক্তি কাজে লাগায়। তৃতীয় শিল্প বিপ্লবের ভিত্তিমূলের সঙ্গে নতুন নতুন প্রযুক্তি যুক্ত হয়ে এখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ঘটে চলছে। এটা অতিবর্ধিত পরিসরের শিল্প বিপ্লব এবং দ্রুত বিকাশমান ডিজিটাল বিপ্লব, যা গত শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকেই ঘটে চলেছে। বহু ধারার প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের এই মিশ্রণ বা যোগফল বৈশিষ্ট্যগতভাবে শারীরিক, ডিজিটাল ও জৈবিক ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে সমন্বয় করবে, এদের মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে আনবে, কিংবা কিছু ক্ষেত্রে বিদ্যমান সম্পর্কগুলো আরও জটিল ও অনিয়ন্ত্রিত করে তুলবে।
আজকের যুগের ডিজিটাল বিপ্লব, যাকে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব শব্দটির উৎপত্তি ২০১১ সালে, জার্মান সরকারের একটি হাই টেক প্রকল্প থেকে। একে সর্বপ্রথম বৃহৎ পরিসরে তুলে নিয়ে আসেন ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা এবং চেয়ারম্যান ক্লস শোয়াব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব হলো— আধুনিক ও স্মার্ট প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রচলিত উৎপাদন এবং শিল্প ব্যবস্থার স্বয়ংক্রিয়করণের একটি চলমান প্রক্রিয়া। আজকের যুগের ডিজিটাল বিপ্লব, যাকে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব শব্দটির উৎপত্তি ২০১১ সালে, জার্মান সরকারের একটি হাই টেক প্রকল্প থেকে।
ইন্টারনেটের আর্বিভাবে তৃতীয় শিল্প বিপ্লবের পর তথ্যপ্রযুক্তির বাধাহীন ব্যবহার ও দ্রুত তথ্য স্থানান্তরের মাধ্যমে গোটা বিশ্বের জীবন প্রবাহের গতি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ইন্টারনেট অব থিংকিং (আইওটি) ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়বে যেটি কিনা মানব সম্পদের বিকল্প হিসেবে কাজ করবে। এই ডিজিটাল বিপ্লবের ছোয়ায় উৎপাদন ব্যবস্থার ঘটবে অকল্পনীয় পরিবর্তন। যেখানে উৎপাদনের জন্য মানুষকে যন্ত্র চালাতে হবেনা, বরং যন্ত্র সয়ংক্রীয়ভাবে কর্ম সম্পাদন করবে এবং এর কাজ হবে আরও নিখুঁত ও নির্ভূল।চিকিৎসা, যোগাযোগ, প্রকাশনা ইত্যাদি ক্ষেত্রেও এর প্রভাব হবে অত্যন্ত জোরালো।
বাংলাদেশে এই বিপ্লবের সুযোগ গ্রহণ করতে হলে আগাম ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি আইওটি,ব্লকচেইন ও রোবটিক্স ইত্যাদির ব্যবহার করতে দ্রুত কৌশলগত পরিকল্পনা করতে হবে। ৪র্থ শিল্প বিপ্লবের সুযোগকে কাজে লাগাতে হলে আমাদের প্রধানতম লক্ষ্য হতে হবে ৪র্থ শিল্প বিপ্লবের উপযোগী সুদক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি, আর এজন্য প্রয়োজন হবে শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন।
বাংলাদেশে বর্তমানে তরুণের সংখ্যা ৪ কোটি ৭৬ লাখ যা মোট জনসংখ্যার ৩০%। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আগামী ৩০ বছর জুড়ে তরুণ বা উৎপাদনশীল জনগোষ্ঠী সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকবে। বাংলাদেশের জন্য ৪র্থ শিল্প বিপ্লবের সুফল ভোগ করার এটাই সব থেকে বড় হাতিয়ার। জ্ঞানভিত্তিক এই শিল্প বিপ্লবে প্রাকৃতিক সম্পদের চেয়ে দক্ষ মানবসম্পদই হবে বেশি মূল্যবান। ৪র্থ শিল্প বিপ্লবের ফলে বিপুল পরিমাণ মানুষ চাকরি হারালেও এর বিপরীতে সৃষ্টি হবে নতুন ধারার নানাবিধ কর্মক্ষেত্র।
চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের ভিত্তি হিসেবে তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। এগুলো হচ্ছে— অত্যাধুনিক প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মাধ্যমে শিল্পের বিকাশ, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মী বাহিনী সৃষ্টি এবং পরিবেশ সংরক্ষণ। মানবসভ্যতা দীর্ঘ যাত্রার ভেতর দিয়ে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের দিকে এগিয়ে এসেছে। এই যাত্রায় মানুষ সব সময়ই কারিগরিভাবে উন্নত উপায়ে শিল্প উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনাগত রূপান্তর ঘটিয়ে চলেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই রূপান্তরের প্রস্তুতিতে ব্যাপকতা এসেছে এবং তা অভাবিত গতিতে প্রযুক্তিগত বিপ্লবের দিকে যাচ্ছে। এই বিপ্লব মোকাবিলায় সরকারের সব বিভাগের প্রস্তুতি রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব কিংবা তার পরবর্তী সময়কে মোকাবিলা করতে ডিজিটাল সংযুক্তির জন্য যতটুকু প্রস্তুতির দরকার, সরকার তার পুরোটাই সম্পন্ন করেছে। এক্ষেত্রে যেসব ত্রুটি এখনও বিদ্যমান, তা চলতি বছরের মধ্যে দূর হয়ে যাবে বলেও মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র জানিয়েছে, পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশ এখনও ৫জি চালুর বিষয়টি চিন্তাও করেনি। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার তার জনসাধারণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, ২০২১ সালের মধ্যেই ৫জি চালু করেছে। ২০২৩ সালে আসছে তৃতীয় সাবমেরিন ক্যাবল। ২০২১ সালেই হাওর, বিল, চর ও পার্বত্য অঞ্চল ক্যাবল বা স্যাটেলাইট সংযোগের আওতায় এসেছে।
সুইডেনের ভোডাফোনে কর্মরত প্রকৌশলী এবং টেকসই উন্নয়ন বিষয়ক লেখক ফাইজ তাইয়েব আহমেদ বলেছেন, ‘এই চ্যালেঞ্জে উৎরাতে না পারলে নতুন শিল্প বিপ্লব আমাদের ফেলেই এগিয়ে যাবে। মানবসভ্যতা দীর্ঘ যাত্রার ভেতর দিয়ে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের দিকে এগিয়ে এসেছে। এই যাত্রায় মানুষ সব সময়ই কারিগরিভাবে উন্নত উপায়ে শিল্প উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনাগত রূপান্তর ঘটিয়ে চলেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই রূপান্তরের প্রস্তুতিতে ব্যাপকতা এসেছে এবং তা অভাবিত গতিতে একটা প্রযুক্তিগত বিপ্লবের দিকে যাচ্ছে।’
তার মতে, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব হচ্ছে, যা পাল্টে দিয়েছে সারা বিশ্বের শিল্প উৎপাদন, বাজার ও ব্যবসার সমুদয় গতিপথ, পাল্টে দিয়েছে মানবসভ্যতার ইতিহাস ও মানুষের জীবনাচরণ।
তিনি মনে করেন, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব আমাদের জীবনযাত্রা, কাজ করার এবং একের সঙ্গে অপরের সম্পর্কিত হওয়ার মৌলিক পদ্ধতিগুলো আমূল পরিবর্তন করে দেবে। শিল্প উৎপাদনগত দিক থেকে এটি মানব বিকাশের একটি নতুন অধ্যায়। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শিল্প বিপ্লবগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে এটা শারীরিক, ডিজিটাল এবং জৈবিক জগৎকে এমনভাবে একাকার করবে, যা নতুন সম্ভাবনার পাশাপাশি অনিয়ন্ত্রিত ভয়াবহ বিপদেরও জন্ম দিতে পারে। ফলে বিপ্লবের গতি, পরিসর এবং গভীরতা ঠিক কীভাবে বিকশিত করা উচিত, তা নিয়ে বিশ্বের দেশগুলো ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে ব্যাপক অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপ জরুরি। নতুন প্রযুক্তিগুলোর কাজ কীভাবে মানবিক মূল্যবোধকে শ্রদ্ধা করবে, জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার সনদ সমুন্নত রাখবে এবং রাষ্ট্রে, সমাজে ও ব্যবসায়ে মানবিকতা, দেশে দেশে ধর্মীয় মূল্যবোধের সহনশীলতা বজায় রাখার পাশাপাশি নতুন মূল্যবোধ তৈরি করবে, তার পর্যালোচনাও চলছে বিশ্বজুড়ে। এমনকি মানুষ হওয়ার অর্থ ভবিষ্যতে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করা হবে, সে বিষয়ে বোঝাপড়াও দরকার। এ অবস্থায় একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, মানবিককেন্দ্রিক ভবিষ্যৎ তৈরির জন্য বাংলাদেশ সরকার, শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি নাগরিক সমাজের সবাইকে কাজ করতে হবে।
চতুর্থ শিল্প বিপ্লব মোকাবিলা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন— অদূর ভবিষ্যতে মানুষকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন যন্ত্রের সঙ্গে সহাবস্থান করতে হবে। কিছু নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। যেমন- মেশিন মানুষের কর্মক্ষেত্রকে সংকুচিত করবে। সস্তা শ্রমের চাহিদা কমে যাবে। অসমতা বৃদ্ধি পাবে এবং অভিবাসনকে উৎসাহিত করবে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বৈদেশিক বিনিয়োগ কমবে এবং প্রযুক্তিগত জ্ঞানের ক্ষেত্রে বৈষম্য বাড়বে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো— উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলো যার যার গতিতে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলবে, যদি প্রযুক্তি সহজলভ্য এবং সহজে হস্তান্তরযোগ্য না হয়।
প্রধানমন্ত্রী মনে করেন, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাছে প্রযুক্তির সহজলভ্য ও পর্যাপ্ত হস্তান্তর নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। প্রযুক্তিতে উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোর তাল মিলিয়ে চলাই চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ হবে বলেও মনে করেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, ‘চতুর্থ শিল্প বিপ্লব মোকাবিলায় সরকার পুরোপুরি প্রস্তুত। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এর বাইরে নয়। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব মোকাবিলায় সবার সঙ্গে এগুতে হবে।
#
অকা/শিখা/ দুপুর, ৬ মার্চ, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 3 years আগে

