বিশেষ প্রতিবেদন>

দেশের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা, বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত পড়ে থাকা বিনিয়োগকারীদের অর্থ ও শেয়ার সুশৃঙ্খলভাবে ব্যবস্থাপনার জন্য নতুন আইন করতে যাচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্যে ‘বাংলাদেশ ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড আইন, ২০২৬’-এর খসড়া প্রস্তুত করেছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।

নতুন আইনের মাধ্যমে বাংলাদেশ ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড (সিএমএসএফ)কে একটি পূর্ণাঙ্গ সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়া হবে। একই সঙ্গে ফান্ডের প্রশাসন, সম্পদ ব্যবস্থাপনা, জবাবদিহি ও কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি সুস্পষ্ট আইনি কাঠামো তৈরি করা হবে। ইতোমধ্যে খসড়াটি জনমতের জন্য প্রকাশ করা হয়েছে এবং বর্তমানে অর্থ মন্ত্রণালয়ের নীতিগত ও আইনগত পর্যালোচনায় রয়েছে।

অব্যবহৃত সম্পদের কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা

বর্তমানে তালিকাভুক্ত অনেক কোম্পানির নগদ লভ্যাংশ, বোনাস শেয়ার, রাইটস শেয়ার, আইপিও ও কিউআইওর রিফান্ড অর্থ বছরের পর বছর অনাদায়ী অবস্থায় পড়ে থাকে। নতুন আইনে এসব অব্যবহৃত সম্পদ সিএমএসএফের অধীনে সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার বিধান রাখা হয়েছে।

তবে এতে বিনিয়োগকারীদের মালিকানা ক্ষুণ্ন হবে না। প্রকৃত মালিক বা বৈধ উত্তরাধিকারীরা নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় আবেদন করলে প্রয়োজনীয় যাচাই শেষে তাদের সম্পদ ফেরত দেওয়া হবে।

ডিজিটাল হবে লভ্যাংশ বিতরণ

আইনটি কার্যকর হলে সিএমএসএফকে দেশের শেয়ারবাজারে একটি কেন্দ্রীয় ডিভিডেন্ড ডিস্ট্রিবিউশন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর নগদ লভ্যাংশ বিতরণ আরও দ্রুত, ডিজিটাল ও স্বচ্ছ হবে।

একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীরা একটি অর্থবছরে বিভিন্ন কোম্পানি থেকে পাওয়া সব লভ্যাংশের বিপরীতে উৎসে কাটা করের চালান এবং কর কর্তনের সনদ এক জায়গা থেকেই সংগ্রহ করতে পারবেন। এতে কর-সংক্রান্ত জটিলতা কমবে এবং তথ্য ব্যবস্থাপনা আরও সহজ হবে।

পরিচালনায় থাকবে শক্তিশালী কাঠামো

খসড়া আইনে সিএমএসএফ পরিচালনার জন্য একটি পরিচালনা পর্ষদ গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। পর্ষদে চেয়ারম্যান ছাড়াও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), আর্থিক খাত ও পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি এবং স্বতন্ত্র সদস্যরা থাকবেন। ফান্ডের নির্বাহী কার্যক্রম পরিচালনা করবেন একজন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)।

এ ছাড়া ফান্ডের অর্থ কীভাবে ব্যবহার করা হবে, কোন খাতে বিনিয়োগ করা যাবে এবং কীভাবে হিসাব ও নিরীক্ষা পরিচালিত হবে—এসব বিষয়ও আইনে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

জবাবদিহি ও শাস্তির বিধান

প্রস্তাবিত আইনে নিরীক্ষা, হিসাব সংরক্ষণ, বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ এবং প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাশাপাশি তথ্য গোপন, বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদান কিংবা ফান্ড-সংশ্লিষ্ট সম্পদের অপব্যবহারের ঘটনায় শাস্তির বিধানও রাখা হয়েছে।

নতুন আইন কার্যকর হলে বর্তমানে প্রচলিত বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড) বিধিমালা, ২০২১ বাতিল হবে।

কী বলছেন সিএমএসএফ কর্মকর্তা

সিএমএসএফের অপারেশন বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক মো. ওয়াসি আজম বলেন, নতুন আইন কার্যকর হলে সিএমএসএফ দেশের শেয়ারবাজারে একটি আধুনিক কেন্দ্রীয় নগদ লভ্যাংশ বিতরণ ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করতে পারবে। এতে লভ্যাংশ বিতরণ হবে আরও স্বচ্ছ, দ্রুত ও প্রযুক্তিনির্ভর।

তিনি বলেন, বিনিয়োগকারীরা একক প্ল্যাটফর্ম থেকে লভ্যাংশ-সংক্রান্ত কর চালান ও কর কর্তনের সনদ সংগ্রহের সুযোগ পাবেন। ফলে কর ব্যবস্থাপনা সহজ হবে এবং বিনিয়োগকারীদের ভোগান্তিও কমবে।

আস্থা ফেরাতে নতুন উদ্যোগ

পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে অনাদায়ী লভ্যাংশ ও বিনিয়োগকারীদের সম্পদ ব্যবস্থাপনায় একটি কার্যকর আইনি কাঠামোর প্রয়োজন ছিল। নতুন আইন সেই শূন্যতা পূরণ করবে। একই সঙ্গে সিএমএসএফের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়বে, সম্পদ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে এবং বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

সরকারের প্রত্যাশা, নতুন আইন কার্যকর হলে শুধু অব্যবহৃত সম্পদের সুশাসনই নিশ্চিত হবে না, বরং একটি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও অধিক জবাবদিহিমূলক পুঁজিবাজার গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।

সর্বশেষ হালনাগাদ 5 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version