অর্থকাগজ প্রতিবেদন 

পুঁজি বাজারে কারসাজি, ভেতরের তথ্যের অপব্যবহার এবং আর্থিক অনিয়ম দীর্ঘদিন ধরেই বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে নড়বড়ে করে আসছে। এই প্রেক্ষাপটে বাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও অনিয়ম উন্মোচনে সাহসী তথ্যদাতাদের সুরক্ষা দিতে নতুন একটি বিধিমালার খসড়া প্রস্তুত করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি এ খসড়ার ওপর নাগরিক, বিনিয়োগকারী ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত আহ্বান করেছে, যাতে চূড়ান্ত রূপ দেওয়ার আগে তা আরও পরিপূর্ণ ও কার্যকর করা যায়।

প্রস্তাবিত বিধিমালার নাম রাখা হয়েছে ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (শেয়ার বাজার সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশ এবং হুইসেলব্লোয়ার সুরক্ষা) বিধিমালা, ২০২৬’। এটি প্রণয়নে ব্যবহার করা হয়েছে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯ এবং বিএসইসি আইন, ১৯৯৩-এ প্রদত্ত ক্ষমতা। সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাজারে সংঘটিত বিভিন্ন অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিজ্ঞতা থেকেই এমন একটি কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।

এই খসড়া বিধিমালা মূলত দুটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তির ওপর দাঁড়ানো।

প্রথমত, পুঁজি বাজারে তথ্য প্রকাশের প্রক্রিয়াকে আরও সুসংহত ও বাধ্যতামূলক করা। তালিকাভুক্ত কোম্পানি, মধ্যস্থতাকারী ও অন্যান্য অংশীজনদের কাছ থেকে সময়োপযোগী, নির্ভুল ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ নিশ্চিত করতে একটি শক্তিশালী কাঠামো প্রণয়ন করা হচ্ছে। এর ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা গুজব বা অসম্পূর্ণ তথ্যের ওপর নির্ভর না করে যাচাইযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। দীর্ঘমেয়াদে এটি বাজারের স্বচ্ছতা ও আস্থা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে।

দ্বিতীয়ত, অনিয়ম বা কারসাজির বিষয়ে তথ্য সরবরাহকারীদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা। আন্তর্জাতিকভাবে ‘হুইসেলব্লোয়ার’ হিসেবে পরিচিত এসব ব্যক্তি অনেক সময় পেশাগত ঝুঁকি, সামাজিক চাপ কিংবা আইনি জটিলতার আশঙ্কায় সামনে আসতে দ্বিধাগ্রস্ত হন। প্রস্তাবিত বিধিমালায় তাদের পরিচয় গোপন রাখা, হয়রানি থেকে রক্ষা করা এবং প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা দেওয়ার মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকার কথা জানা গেছে। এর ফলে অভ্যন্তরীণ অনিয়ম উন্মোচনে উৎসাহ বাড়বে বলে মনে করছে কমিশন।

পুঁজি বাজারে অনিয়ম সাধারণত দুইভাবে ক্ষতি করে—প্রথমত, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন; দ্বিতীয়ত, বাজারের সামগ্রিক বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যায়। আস্থাহীন বাজারে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ আসে না, ফলে অর্থনীতির মূলধন গঠনের প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়।

বিএসইসি মনে করছে, তথ্য প্রকাশে কঠোরতা ও তথ্যদাতাদের সুরক্ষা—এই দ্বিমুখী কৌশল কার্যকর হলে সিন্ডিকেটভিত্তিক কারসাজি ও ভেতরের লেনদেন অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে এটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকি সক্ষমতাকেও পরোক্ষভাবে শক্তিশালী করবে, কারণ ভেতরের তথ্য দ্রুত তাদের হাতে পৌঁছাবে।

বর্তমানে বিধিমালাটি খসড়া পর্যায়ে রয়েছে। ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান—যে কেউ এতে গঠনমূলক মতামত, পরামর্শ বা আপত্তি জানাতে পারবেন। প্রাপ্ত মতামত পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত সংস্করণ প্রণয়ন করা হবে। এই উন্মুক্ত প্রক্রিয়া নিজেই একটি ইতিবাচক বার্তা দেয়—বাজার সংস্কারে অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে।

অকা/পুঁবা/ই/সকাল/২ মার্চ, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 6 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version