অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
দেশের পুঁজি বাজারকে আরও গতিশীল, স্থিতিশীল এবং বিনিয়োগবান্ধব করতে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে ব্যাপক কর সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রাক-বাজেট আলোচনায় উপস্থাপিত এই প্রস্তাবগুলো মূলত দীর্ঘমেয়াদে বাজারের গভীরতা বাড়ানো, নতুন বিনিয়োগ টানা এবং ঝুঁকি কমানোর কৌশল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ডিএসই প্রতিনিধিরা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন—বর্তমান কর কাঠামো বাজারের স্বাভাবিক বিকাশে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। তাদের মতে, করনীতিকে বিনিয়োগবান্ধব না করলে শেয়ারবাজার কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা রাখতে পারবে না।
প্রস্তাবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বন্ড বাজারকে শক্তিশালী করা। ডিএসই মনে করছে, তালিকাভুক্ত বন্ড থেকে প্রাপ্ত সুদের ওপর কর সুবিধা না থাকায় এ খাতের প্রবৃদ্ধি সীমিত। তাই ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্যান্য বিনিয়োগকারীদের জন্য নির্দিষ্ট বন্ডে পাঁচ বছরের কর অব্যাহতি এবং করপোরেট বন্ডে ১০ শতাংশ উৎস করকে চূড়ান্ত কর হিসেবে গণ্য করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর ফলে বন্ডবাজারে অংশগ্রহণ বাড়বে, কর্পোরেট খাত বিকল্প অর্থায়নের সুযোগ পাবে এবং সরকারের ঋণগ্রহণ ব্যয়ও তুলনামূলক কমে আসতে পারে।
বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের প্রণোদনা চেয়েছে ডিএসই। তাদের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ মোট লেনদেনের মাত্র ১.৫৭ শতাংশে সীমাবদ্ধ। এই বাস্তবতায় অ-নিবাসীদের মূলধনী মুনাফার ওপর পাঁচ বছরের জন্য কর অব্যাহতির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের কর সুবিধা চালু হলে বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগ বাড়বে, বাজারে তারল্য বৃদ্ধি পাবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পখাতকে (এসএমই) পুঁজি বাজারমুখী করতে ডিএসই আরও প্রস্তাব দিয়েছে, এসএমই বোর্ডে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর জন্য পাঁচ বছরের কর অবকাশ দেওয়া হোক। বর্তমানে এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য ২০ শতাংশ করহার প্রযোজ্য, যা নতুন উদ্যোক্তাদের বাজারে আসতে নিরুৎসাহিত করে। প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে নতুন কোম্পানির তালিকাভুক্তি বাড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে করভিত্তি বিস্তৃত হবে।
একইসঙ্গে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে মিউচুয়াল ফান্ড, ইউনিট সার্টিফিকেট ও এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ডে (ইটিএফ) বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কর রেয়াতের সীমা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। এতে বিনিয়োগ ঝুঁকি বৈচিত্র্য করা সহজ হবে এবং বাজারে স্থিতিশীলতা বাড়বে।
ডিএসই আরও উল্লেখ করেছে, ব্যবসায়িক ক্ষতি অন্যান্য আয়ের বিপরীতে সমন্বয়ের সুযোগ পুনর্বহাল করা জরুরি। এতে ক্ষতিগ্রস্ত কোম্পানিগুলো পুনরুদ্ধারের সুযোগ পাবে এবং ভবিষ্যতে করদাতা হিসেবে টিকে থাকতে পারবে। পাশাপাশি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য মূলধনী মুনাফার কর কাঠামো সহজ করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত মূলধনী মুনাফা করমুক্ত রাখা এবং এর অতিরিক্ত অংশে মাত্র ৫ শতাংশ কর আরোপ করা উচিত, যেখানে বর্তমানে এই হার ১৫ শতাংশ।
এছাড়া ডিভিডেন্ড আয়ের ওপর উৎসে কাটা করকে চূড়ান্ত কর হিসেবে গণ্য করার সুপারিশ করা হয়েছে, যাতে বিনিয়োগকারীদের কর সংক্রান্ত জটিলতা কমে এবং নিয়মিত আয়ের উৎস হিসেবে ডিভিডেন্ডভিত্তিক বিনিয়োগ বাড়ে।
ডিএসইর পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, দেশের প্রায় এক কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শেয়ারবাজারের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ফলে একটি শক্তিশালী, স্বচ্ছ এবং স্থিতিশীল পুঁজিবাজার শুধু বিনিয়োগকারীদের জন্য নয়, সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও অপরিহার্য।
সার্বিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ডিএসইর প্রস্তাবগুলো কেবল কর ছাড় নয়—এগুলো একটি দীর্ঘমেয়াদি বাজার পুনর্গঠনের রূপরেখা। সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে শেয়ারবাজারে আস্থা ফিরে আসবে, নতুন বিনিয়োগের প্রবাহ তৈরি হবে এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে পুঁজিবাজার আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে। ●
অকা/পুঁবা/ই/সকাল/২ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 13 hours আগে

