অর্থকাগজ প্রতিবেদন 

দীর্ঘস্থায়ী পতনে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে দেশের শেয়ার বাজারের সম্পূর্ণ ইকোসিস্টেম। শুধু সাধারণ বিনিয়োগকারী নয়, বাজারসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোও এখন ভয়াবহ আর্থিক চাপে রয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ডিএসই, সিএসই ও মার্চেন্ট ব্যাংক মিলিয়ে মোট ৩১১টি প্রতিষ্ঠান বর্তমানে বড় ধরনের প্রভিশন ঘাটতিতে ডুবে আছে। এদের সম্মিলিত ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ১৫৪ কোটি টাকারও বেশি। এই তালিকায় রয়েছে ডিএসইর ২১১টি স্টেকহোল্ডার, সিএসইর ৩৬টি প্রতিষ্ঠান এবং ৪৪টি মার্চেন্ট ব্যাংক—যাদের সবার ওপরেই লোকসানের বিপরীতে বাধ্যতামূলক প্রভিশন সংরক্ষণের চাপ ক্রমেই বাড়ছে।

২০১৬ সাল থেকে প্রভিশনিং কঠোরভাবে বাস্তবায়নের জন্য বিএসইসি নিয়ম চালু করলেও প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় প্রতিবছরই সময় বাড়ানোর আবেদন জানিয়ে দায়িত্ব এড়ানোর চেষ্টা করেছে। চলতি বছর কমিশন ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত শেষ সময় বাড়ালেও বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান এখনও কার্যকর কর্মপরিকল্পনা জমা দেয়নি। গত ১৩ নভেম্বরের কমিশন সভায় আরও ২৮টি ব্রোকারেজ ও মার্চেন্ট ব্যাংককে পরিকল্পনা জমা দেওয়ার জন্য অতিরিক্ত সময় দিতে হয়েছে। কমিশনের কর্মকর্তাদের বক্তব্য—সময়সীমা শেষ না হওয়া পর্যন্ত ব্যর্থতার অভিযোগ তোলা যাবে না, কিন্তু বাস্তবে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রস্তুতি খুবই দুর্বল।

বাজারসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা—শেয়ার বাজারে বছরের পর বছর ধরে চলা মন্দা এখন বড় আকারের আনরিয়েলাইজড লস তৈরি করেছে। পূর্ববর্তী কমিশনের আরোপিত ফ্লোর প্রাইস বাজারকে স্থবির করে দিয়েছে; বিনিয়োগ আটকে থেকে অনেক প্রতিষ্ঠানের ইকুইটি ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে। ব্যবসা-লেনদেন কমে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলো বাড়তি আয় করতে পারেনি, ফলে প্রভিশন সংরক্ষণের সক্ষমতাও কমে গেছে।

সর্বশেষ আগস্ট পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী ডিএসইর ২১১ প্রতিষ্ঠানের আনরিয়েলাইজড লোকসান দাঁড়িয়েছে ১,৯০৬ কোটি ২৪ লাখ টাকা; প্রভিশন আছে মাত্র ৯১৫ কোটি ২৯ লাখ টাকার। সিএসইর ৫৬ প্রতিষ্ঠানে লোকসান ২২ কোটি ১৩ লাখ টাকা; প্রভিশন মাত্র ১০ কোটি ৭৫ লাখ। অন্যদিকে ৪৪টি মার্চেন্ট ব্যাংকের আনরিয়েলাইজড লোকসান প্রায় ১,৮০৭ কোটি টাকা; প্রভিশন করা হয়েছে মাত্র ৬৫৫ কোটি ৩৫ লাখ। সব মিলিয়ে ৩,৭৩৫ কোটি টাকার লোকসানের বিপরীতে প্রতিষ্ঠানগুলো প্রভিশন করতে পেরেছে মাত্র ১,৫৮১ কোটি ৩৯ লাখ টাকা, ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২,১৫৪ কোটি টাকায়।

এই পরিস্থিতির পেছনে শুধু বাজারমন্দাই দায়ী নয়। ২০১০ সালের ধসের পর থেকেই বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ কৌশলে ব্যাপক দুর্বলতা রয়ে গেছে। বাজারের স্বল্পমেয়াদি উত্থান দেখে পরিকল্পনাহীনভাবে বিনিয়োগ করা, লোকসানি কোম্পানিতে অযথা অর্থ ঢালা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অনুপস্থিতি এবং প্রয়োজনীয় সময়ে শেয়ার বিক্রি না করে ধরে রাখা—এসব কারণে বছরে বছরে আনরিয়েলাইজড লস ফুলে উঠেছে। ফলে পোর্টফোলিও আটকে যাওয়ার পাশাপাশি বাজারের সামগ্রিক তারল্য সংকটও তীব্র হয়েছে।

সবচেয়ে বিপদে রয়েছে যেসব মার্চেন্ট ব্যাংক বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাবসিডিয়ারি কোম্পানি হিসেবে বাজারে বিনিয়োগ করেছিল। ২০০০ সালের দিকে কিছু ব্যাংক বাজার থেকে বড় মুনাফা করায় অনুকরণে অন্যান্য ব্যাংকও সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কয়েক হাজার কোটি টাকা ঢালে। ২০০৯–১০ সালের বুমের পর ধস নামতেই এসব প্রতিষ্ঠানের পোর্টফোলিও ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়ে। এখন তারা প্রভিশন সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতায় সবচেয়ে বড় আর্থিক চাপে রয়েছে—এবং সামগ্রিক বাজারের ঝুঁকিও বেড়ে যাচ্ছে।
অকা/পুঁবা/ই/সকাল/২৩ নভেম্বর, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 3 months আগে

Leave A Reply

Exit mobile version