অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট দেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব এবং শূন্য কার্বন নির্গমন – এই তিনটি সুদূরপ্রসারী লক্ষ্যকে সামনে রেখে প্রণীত হয়েছে এই বাজেট। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই সমাজ গঠনের সুস্পষ্ট রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে এবারের বাজেটে।
'তিন শূন্য' তত্ত্ব: একটি উন্নত সমাজের স্বপ্ন
অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় জোর দিয়ে বলেছেন, "অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে এনে একটি উন্নত সমাজ বিনির্মাণের উদ্দেশ্যে আমরা যেসব কার্যক্রম গ্রহণ করেছি, তার মূল লক্ষ্য হচ্ছে শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব ও শূন্য কার্বনভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণ। যার মাধ্যমে এ দেশের মানুষের জীবনমানের আমূল পরিবর্তন হবে এবং মুক্তি মিলবে বৈষম্যের দুষ্টচক্র থেকে।"
এই 'তিন শূন্য' বা 'থ্রি জিরো' তত্ত্বের প্রবক্তা হলেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস, যিনি গ্রামীণ ব্যাংক ও ক্ষুদ্রঋণ চালুর জন্য বিশ্বজুড়ে সুপরিচিত। তাঁর এই তত্ত্ব টেকসই উন্নয়নে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
অর্থ উপদেষ্টা আরও বলেন, "যে স্বপ্নকে ধারণ করে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ভিতর রচিত হয়েছিল, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে আগামী প্রজন্মের জন্য আমরা একটি সুন্দর, বাসযোগ্য আবাসস্থল রেখে যেতে চাই, জনগণের জীবনযাত্রায় নিয়ে আসতে চাই এক সুদূরপ্রসারী পরিবর্তনের ঢেউ। আমরা সে লক্ষ্যকে সামনে রেখে এবারের বাজেট সাজানোর চেষ্টা করেছি।"
প্রবৃদ্ধি থেকে সামগ্রিক উন্নয়নে ফোকাস
বাজেট বক্তৃতায় উল্লেখ করা হয়েছে, "আমাদের এবারের বাজেট কিছুটা ব্যতিক্রমধর্মী। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আমরা বিগত বাজেটের চেয়ে ছোট আকারের বাজেট আগামী অর্থবছরের জন্য প্রস্তাব করছি। প্রবৃদ্ধি-কেন্দ্রিক ধারণা থেকে সরে এসে আমরা চেষ্টা করেছি সামগ্রিক উন্নয়নের ধারণায় জোর দিতে। তাই প্রথাগত ভৌত অবকাঠামো তৈরির খতিয়ান তুলে ধরার পরিবর্তে আমরা এবারের বাজেটে প্রাধান্য দিয়েছি মানুষকে।"
অর্থ উপদেষ্টা মনে করেন, মানুষের জীবনমান, জীবিকা ও পরিবেশগত ভারসাম্য ছাড়া রাষ্ট্রের ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই মৌলিক অধিকার নিশ্চিতকরণ, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি এবং বৈষম্য হ্রাসের লক্ষ্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সুশাসন, নাগরিক সুবিধা ও কর্মসংস্থানে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সম্ভাবনা, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের প্রেক্ষাপট এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট নতুন সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় রেখে একটি টেকসই ও অভিযোজন-ক্ষম উন্নয়ন কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে। এই বাজেটকে একটি রূপান্তরমুখী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যার মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায্য সমাজ গঠনের ভিত্তি রচিত হবে বলে অর্থ উপদেষ্টা প্রত্যাশা করেন।
মোট বাজেট - ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তুলনায় ৭ হাজার কোটি টাকা কম। এটি স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো বাজেটের আকার হ্রাস পাওয়ার ঘটনা।
রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা - জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যা জিডিপির ৯% এবং চলতি অর্থবছরের তুলনায় ৩৮ হাজার কোটি টাকা বেশি।
ঘাটতি - ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি ধরা হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় ৩০ হাজার কোটি টাকা কম। এর অর্ধেকের বেশি বিদেশি ঋণ ও অনুদান থেকে এবং বাকি অংশ অভ্যন্তরীণ উৎস (ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্র) থেকে সংগ্রহ করা হবে।
উন্নয়ন ব্যয় - ২ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যার মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) এর জন্য ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ থাকতে পারে।
কিছু পণ্যের শুল্ক-কর কমানোর প্রস্তাব: স্বস্তির নিঃশ্বাস?
২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় এবং ব্যবহৃত পণ্যের শুল্ক-কর কমানোর প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ। সাধারণত শুল্ক-কর কমার প্রভাব বাজারে দেরিতে পড়লেও, এর ফলে ভোক্তাদের জন্য দাম কমার একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে।
আজ (সোমবার, জুন ২, ২০২৫) বিকেলে বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) জাতির উদ্দেশে দেওয়া বাজেট ভাষণে এই প্রস্তাবগুলো তুলে ধরা হয়। বাজেটে ঘোষিত শুল্ক-কর প্রস্তাবগুলো তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয়।
যেসব পণ্যের দাম কমতে পারে:
- চিনি: পরিশোধিত চিনি আমদানিতে টনপ্রতি শুল্ক ৫০০ টাকা কমিয়ে ৪ হাজার টাকা করা হয়েছে। ফলে চিনির দাম কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
- স্যানিটারি ন্যাপকিন: স্যানিটারি ন্যাপকিনের স্থানীয় ব্যবসায়ী পর্যায়ে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
- তরল দুধ: প্যাকেটজাত তরল দুধে স্থানীয় পর্যায়ে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
- কলম: বলপয়েন্ট পেনে স্থানীয় পর্যায়ে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
- বিদেশি মাছ ও মাংস: সম্পূরক শুল্ক কমানোর ফলে বিদেশি মাছ (যেমন স্যামন, টুনা) ও মাংসের দাম কমতে পারে।
- আইসক্রিম: আইসক্রিমের ওপর সম্পূরক শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে, যা দাম কমার সম্ভাবনা তৈরি করবে।
- কম্পিউটার মনিটর: ২২ ইঞ্চির বদলে ৩০ ইঞ্চি পর্যন্ত কম্পিউটার মনিটর বা পর্দায় উৎপাদন ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। ইন্টারেকটিভ মনিটরও এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
- বাটার: বাটার আমদানিতে ৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে, ফলে আমদানি করা বাটারের দাম কিছুটা কমতে পারে।
- বিদেশি প্লাস্টিকের তৈজসপত্র: বিদেশি প্লাস্টিকের তৈজসপত্রের সম্পূরক শুল্ক ৫ শতাংশ কমানো হয়েছে।
- বিদেশি পোশাক ও জুতা: পুরুষ, নারী ও শিশুদের বিদেশি পোশাক এবং বিদেশি জুতা ও স্যান্ডেলের ওপর সম্পূরক শুল্ক কিছুটা কমানো হয়েছে, ফলে দাম কমতে পারে।
কিছু পণ্যের শুল্ক-কর বাড়ানোর প্রস্তাব: বাড়তি খরচ?
২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কিছু পণ্যের শুল্ক-কর বাড়ানোর প্রস্তাবও দিয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ। সাধারণত শুল্ক-কর বৃদ্ধির প্রভাব বাজারে দ্রুত পড়ে।
আজ (সোমবার, জুন ২, ২০২৫) বিকেলে বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) জাতির উদ্দেশে দেওয়া বাজেট ভাষণে এই প্রস্তাবগুলো তুলে ধরা হয়। বাজেটে ঘোষিত শুল্ক-কর প্রস্তাবগুলো তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয়।
বাজেট বক্তৃতা, অর্থ বিল ও কাস্টমস কর্মকর্তাদের পাঠানো নির্দেশিকা ঘেঁটে দেখা যায়, বেশ কিছু পণ্যের ওপর শুল্ককর বাড়ানো হয়েছে।
যেসব পণ্যের দাম বাড়তে পারে:
- মুঠোফোন: দেশে মুঠোফোন উৎপাদন ও সংযোজনে মূল্য সংযোজন কর (মূসক/ভ্যাট) অব্যাহতি সুবিধা কিছুটা কমানো হয়েছে এবং মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে মুঠোফোনের দাম বাড়তে পারে।
- ওয়াশিং মেশিন, ব্লেন্ডার ও অন্যান্য গৃহস্থালি সরঞ্জাম: ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওয়েভ ওভেন, ব্লেন্ডার, জুসার, আয়রন, রাইস কুকার, প্রেসার কুকার ইত্যাদি উৎপাদনে ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা কিছুটা কমানো হয়েছে।
- প্লাস্টিকের তৈজসপত্র: থালাবাসনসহ প্লাস্টিকের তৈজসপত্র, গৃহস্থালি সামগ্রী ও সমজাতীয় পণ্যে ভ্যাটের হার দ্বিগুণ, অর্থাৎ ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। তবে পরিবেশবান্ধব তৈজসপত্রে ভ্যাট ছাড় দেওয়া হয়েছে।
- এলপিজি সিলিন্ডার: তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সিলিন্ডারে স্থানীয় পর্যায়ে ভ্যাট অব্যাহতির সুবিধা কিছুটা কমিয়ে মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে, যা এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বাড়াতে পারে।
- বিদেশি চকলেট: কিছু পণ্যের শুল্কায়ন মূল্য বাড়ানো হয়েছে, যার মধ্যে বিদেশি চকলেট অন্যতম। ইউনিটপ্রতি ৪ ডলারের বদলে এখন ১০ ডলার ধরে শুল্কায়ন হবে, এতে আমদানিতে খরচ বাড়বে।
- লিপস্টিক ও অন্যান্য প্রসাধন: ঠোঁট, চোখ ও মুখমণ্ডলে ব্যবহৃত প্রসাধন আমদানিতে শুল্কায়ন মূল্য অনেকটাই বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে এসব পণ্য আমদানি থেকে বাড়তি কর আদায় হবে এবং দামও বেড়ে যেতে পারে।
- ব্লেড: দাড়ি কাটার খরচ বাড়বে, কারণ দেশে ব্লেড উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট আড়াই শতাংশ বাড়িয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ করা হয়েছে। ●
অকা/প্র/ই/ বিকাল/২ জুন, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 9 months আগে

